বঙ্গোপসাগরে ফের তৈরি হওয়া নিম্নচাপের প্রভাবে বদলে গিয়েছে দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া। বুধবার বিকেলের পর কলকাতা-সহ একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। আজ, বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে, কোথাও কোথাও চরম ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। শুক্রবারও বৃষ্টির দাপট বজায় থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
বুধবার দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিকেলের পর আচমকাই দক্ষিণবঙ্গের আকাশ ঢেকে যায় ঘন কালো মেঘে। পরে সেই মেঘ থেকেই শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। উপগ্রহের ছবিতে ধরা পড়া মেঘের উচ্চতা দেখে আবহবিদদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। জানা গিয়েছে, ওই বজ্রগর্ভ মেঘের স্তম্ভ প্রায় ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল।
আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের মেঘকে বলা হয় ‘কিউমুলোনিম্বাস’। সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস মেঘ ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু বুধবার দক্ষিণবঙ্গের আকাশে তৈরি হওয়া মেঘের স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১৮ কিলোমিটার হওয়াকে বেশ অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মেঘের শীর্ষে তাপমাত্রা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নেমে গিয়েছিল বলেও আবহবিদদের হিসাব।
এই পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নতুন নিম্নচাপ। মৌসম ভবন জানিয়েছে, বুধবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ উত্তর বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলের কাছাকাছি নিম্নচাপটি তৈরি হয়। দুপুর পর্যন্ত সেটি একই অঞ্চলে অবস্থান করলেও সন্ধ্যার দিকে শক্তি বাড়িয়ে সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হয়।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যে এই সুস্পষ্ট নিম্নচাপ আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এরপর সেটি উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোবে। পশ্চিমবঙ্গ ও সংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূল এই নিম্নচাপের সম্ভাব্য গতিপথের মধ্যে রয়েছে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এই নিম্নচাপের প্রভাবে আজ বৃহস্পতিবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। ভারী বৃষ্টি বলতে ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার এবং অতিভারী বৃষ্টি বলতে ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় ২০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে চরম ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান এবং হুগলিতেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত এবং ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কাও থাকছে।
কলকাতার ক্ষেত্রেও স্বস্তির খবর নেই। আগামী ২৪ ঘণ্টা শহরের আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে। দফায় দফায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে রাত কিংবা ভোরের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে পারে। কোনও কোনও সময়ে ঘণ্টায় ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার হারে বৃষ্টিও হতে পারে বলে পূর্বাভাস।
শুধু বৃষ্টিই নয়, নিম্নচাপের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় দমকা হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে রাস্তাঘাটে জল জমা, যান চলাচলে ধীরগতি এবং নিচু এলাকাগুলিতে সাময়িক দুর্ভোগের আশঙ্কা থাকছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।
অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে আপাতত এই নিম্নচাপের সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের মতো ধারাবাহিক ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস নেই। বরং উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ এলাকায় এখনও ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া রয়েছে। ফলে একই রাজ্যে দক্ষিণ ও উত্তরের আবহাওয়ার ছবিতে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন আবহবিদরা। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হলে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। তাই কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দাদের বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের দিকে বজ্রবিদ্যুৎ এবং ভারী বৃষ্টির পরিস্থিতি মাথায় রেখে সতর্ক থাকার প্রয়োজন।



