চামোলির সুড়ঙ্গে জল-বালি-পাথরের স্রোত, রাতভর উদ্ধার অভিযান, মৃত ৭, এখনও আটকে শ্রমিক

উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে THDC-এর নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে জল ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে মৃত ৭, আহত ১৪। NDRF, SDRF, সেনা ও ITBP-র তৎপরতায় চলছে উদ্ধার অভিযান।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে আচমকা জল ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, আহত ১৪। ২২ জন শ্রমিকের মধ্যে অধিকাংশকে উদ্ধার করা গেলেও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের খোঁজে শুক্রবার সকালেও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় অভিযান চলছে। সর্বশেষ রিপোর্টে আটকে থাকা শ্রমিকের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে।

চামোলি জেলার মায়াপুর-পিপলকোটি এলাকায় তেহরি হাইড্রো ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (THDC)-এর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টা নাগাদ বিপর্যয় ঘটে। সুড়ঙ্গের ভিতরে কাজ চলার সময় আচমকাই বিপুল পরিমাণ জল, কাদা, বালি ও পাথর ঢুকে পড়ে। নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিল হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (HCC)।

মুহূর্তের মধ্যে সুড়ঙ্গের একাংশ কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ধ্বংসাবশেষ ও জলের প্রবল স্রোতে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই স্থানীয় প্রশাসন, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF) উদ্ধারকাজ শুরু করে।

মৃত ৭, আহত ১৪

রাতভর উদ্ধার অভিযানের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭ হয়েছে। আহত ১৪ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের শারীরিক অবস্থা গুরুতর, তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রথম দিকে সুড়ঙ্গের ভিতরে ঠিক কতজন শ্রমিক আটকে রয়েছেন, তা নিয়ে প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল না। পরে একে একে বহু শ্রমিকের হদিস মেলে। ২২ জন শ্রমিক সেই সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধারকারীদের তৎপরতায় তাঁদের অধিকাংশকেই বের করে আনা সম্ভব হয়েছে।

তবে দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত জটিল। সুড়ঙ্গের ভিতরে জল জমে রয়েছে, পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে জল চুঁইয়ে পড়ছে। ফলে উদ্ধারকারীদের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ধাপে ধাপে ভিতরের দিকে এগোতে হচ্ছে।

আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছতে জল নিষ্কাশনের পাশাপাশি কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে কাজের গতি ধীর হলেও সুড়ঙ্গের ভিতরে পৌঁছনোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

NDRF, SDRF-এর সঙ্গে সেনা ও ITBP

দুর্ঘটনার পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় NDRF ও SDRF-এর দল। পরে সেনা, ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (ITBP), স্থানীয় পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরাও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। একাধিক সংস্থা একসঙ্গে কাজ করায় রাতভর সমন্বিত উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়েছে।

উদ্ধারকারীদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা জল এবং ধ্বংসস্তূপ। কোথাও কোথাও ভারী যন্ত্রপাতিও সমস্যায় পড়ছে। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভিতরের দিকে এগোচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আটকে থাকা প্রত্যেক শ্রমিককে নিরাপদে বের করে আনাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও যন্ত্রপাতি ও জনবল কাজে লাগানো হচ্ছে।

কেন ঘটল এত বড় বিপর্যয়?

প্রাথমিকভাবে ভূমিধস ও পাহাড়ের উপরের অংশে তৈরি হওয়া গহ্বর দিয়ে জল ও ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। প্রবল বৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের উপরের অংশে একটি ফাঁক বা গহ্বর তৈরি হয়েছিল। সেই পথেই হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে পড়ে। প্রবল স্রোতের ধাক্কায় শ্রমিকদের একটি অংশ সুড়ঙ্গের মুখের দিকে চলে এলেও কয়েকজন ভিতরে আটকে পড়েন।

তবে সুড়ঙ্গের কাঠামোগত কোনও সমস্যা ছিল কি না, নির্মাণকাজের কোনও ত্রুটি ছিল কি না, নাকি সম্পূর্ণভাবেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে এই ঘটনা—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। প্রশাসন দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে।

পরিস্থিতির উপর নজর ধামির

দুর্ঘটনার পর থেকেই গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি (Pushkar Singh Dhami)। উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার বিষয়টিও অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঝাড়খণ্ড ও ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে, কারণ দুর্ঘটনায় জড়িত শ্রমিকদের মধ্যে ওই রাজ্যগুলির বাসিন্দারাও রয়েছেন।

চামোলির এই দুর্ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিয়েছে পাহাড়ি এলাকায় সুড়ঙ্গ নির্মাণের ঝুঁকির কথা। ২০২৩ সালে উত্তরকাশীর সিলকিয়ারা সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে ৪১ জন শ্রমিক ১৭ দিন আটকে থাকার পর দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানে তাঁদের বের করে আনা হয়েছিল। চামোলিতেও এখন প্রশাসনের সামনে একটাই লক্ষ্য—আটকে থাকা প্রত্যেক শ্রমিককে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন