করলা-জাম-নিমের রস খেলেই ৭ দিনে কমবে সুগার? সত্যিটা জানলে ভুল ভাঙবে

করলা, জাম ও নিমের রস ডায়াবিটিসে উপকারী কি না তা নিয়ে নানা দাবি রয়েছে। কিন্তু সাত দিনে ফাস্টিং সুগার কমানোর নিশ্চিত প্রমাণ নেই, জানুন গবেষণার আসল তথ্য।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ফাস্টিং ব্লাড সুগার ১৫০ mg/dL-এর কাছাকাছি হলে বিষয়টি অবহেলা করার মতো নয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই দ্রুত রক্তে শর্করা কমানোর আশায় করলা, জাম ও নিমের রস একসঙ্গে খাওয়া শুরু করেন। দাবি করা হয়, এই ‘হার্বাল শট’ নিয়মিত খেলেই নাকি মাত্র সাত দিনে সুগার নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু সত্যিই কি এত দ্রুত ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে, করলা-জাম-নিমের রসকে ৭ দিনে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের নিশ্চিত উপায় বলা যায় না।

করলা, জাম বা নিমে এমন কিছু জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে, যেগুলি রক্তে গ্লুকোজের উপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন গবেষণা রয়েছে। কিন্তু কোনও একটি রস বা মিশ্রণকে ডায়াবিটিসের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার মতো শক্তিশালী প্রমাণ এখনও নেই। আমেরিকান ডায়াবিটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের গাইডলাইনও গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণের জন্য হার্বাল বা স্পাইস সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের সুপারিশ করে না।

করলা কতটা কার্যকর?

করলায় charantin-সহ বেশ কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। ল্যাবরেটরি ও কিছু মানব-গবেষণায় করলার বিভিন্ন প্রস্তুতি রক্তে গ্লুকোজ কমানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছে। কিন্তু গবেষণাগুলিতে ব্যবহৃত করলার পরিমাণ, নির্যাসের ধরন এবং চিকিৎসার সময়কাল এক নয়। তাই কোনও নির্দিষ্ট পরিমাণ করলার রস খেলেই সাত দিনে ফাস্টিং সুগার কমে যাবে—এমন সার্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, করলা নিয়ে গবেষণার ফলও সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। ফলে ‘প্রতিদিন করলার রস খেলেই ৭ দিনে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণ’—এই দাবি গবেষণার তুলনায় অনেক বেশি জোরালো।

জাম কি রক্তে শর্করা কমাতে পারে?

জাম বা Syzygium cumini নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গিয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ ১৩টি randomized controlled trial এবং ৮০২ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে জাম-সহ Myrtaceae পরিবারের কিছু উদ্ভিজ্জ প্রস্তুতিতে fasting plasma glucose সামান্য কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও গবেষণাগুলির মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল অত্যন্ত বেশি এবং প্রমাণের মান কম থেকে খুব কম বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। HbA1c কমানোর ক্ষেত্রে নিশ্চিত সুবিধাও পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ জাম উপকারী হতে পারে—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু জাম বা জামের রসকে ডায়াবিটিসের নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা বলা যাবে না। বিশেষ করে সাত দিনের মধ্যে সুগার স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই।

নিমের ক্ষেত্রে কী বলছে বিজ্ঞান?

নিম নিয়ে ডায়াবিটিস সংক্রান্ত গবেষণাও হয়েছে। নিমের বিভিন্ন নির্যাসে এমন কিছু যৌগ রয়েছে, যেগুলি গ্লুকোজ বিপাকের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণাগারে দেখা গিয়েছে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে নিম খেয়ে ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন clinical evidence এখনও নেই।

তাই নিমপাতার রস, করলার রস এবং জামের রস একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে সাত দিনের মধ্যে ফাস্টিং সুগার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

ফাস্টিং সুগার ১৫০ হলে কী করবেন?

ফাস্টিং সুগার যদি বারবার ১৫০ mg/dL-এর কাছাকাছি থাকে, শুধু ঘরোয়া পানীয়ের উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ওজন, ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ—সবকিছুর ভূমিকা রয়েছে। আমেরিকান ডায়াবিটিস অ্যাসোসিয়েশনও প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট কমানো এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশেষ করে কেউ যদি ইতিমধ্যেই ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ খান, তাহলে নিজের মতো করে করলা-নিমের ঘন রস বা হার্বাল সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। কারণ রক্তে শর্করা অতিরিক্ত নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হয়। ডায়াবিটিসে ৭০ mg/dL-এর নিচে গ্লুকোজকে hypoglycemia হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তাই করলা, জাম বা নিম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে খাওয়া নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু এগুলিকে ওষুধের বিকল্প ভাবা উচিত নয়। করলা-জাম-নিমের রস ৭ দিনে ডায়াবিটিস সারিয়ে দেবে বা নিশ্চিত ভাবে সুগার নিয়ন্ত্রণে আনবে—এই দাবির পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ফাস্টিং সুগার ১৫০-এর মতো থাকলে সঠিক পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন