গল্পের ছলে পড়ানো হবে পাঠ্যবিষয়—শিশুদের পড়াশোনাকে আরও আনন্দময় ও আকর্ষণীয় করতে প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে নতুন উদ্যোগ নিতে চলেছে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতর। প্রচলিত বইভিত্তিক পড়াশোনার বদলে গল্পের মাধ্যমে পাঠদান চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্বজুড়েই এখন শিশুদের শেখার ক্ষেত্রে গল্পভিত্তিক শিক্ষা (story-based learning) অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। সেই ধারা অনুসরণ করেই ছোটদের স্কুলমুখী করতে এবং তাদের শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ বজায় রাখতে এই নতুন উদ্যোগ নিতে চলেছে রাজ্য।
সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে বাঙালি পরিবারের কাঠামো। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে সীমাবদ্ধ হয়েছে অনেকেই। ফলে ঠাকুমা-দিদিমার গল্প শোনার সেই ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের বেড়ে ওঠার এই পরিবর্তিত বাস্তবতা মাথায় রেখেই গল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদানের এই পদ্ধতি চালু করার কথা ভাবছে শিক্ষা দফতর।


কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রচলিত পড়াশোনাকে আরও সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলতেই এই নতুন পদ্ধতি। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুকে গল্পের আকারে শিশুদের সামনে তুলে ধরলে তারা বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারবে এবং শেখার প্রতি আগ্রহও বাড়বে। সেই লক্ষ্যেই শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
স্কুল শিক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে নির্বাচিত প্রায় ১৫০ জন শিক্ষককে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। স্টেট কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (SCERT)-এর এক আধিকারিক জানান, আগামী দিনে রাজ্যের সব প্রাথমিক শিক্ষকদের এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত দুই দশকে শহরের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে সরকারি ও সরকারপোষিত বাংলা মাধ্যম স্কুল। এর ফলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে বহু জায়গায়। তবে গ্রাম ও মফস্সল এলাকায় এখনও সরকারি প্রাথমিক স্কুলের উপরই ভরসা করেন অধিকাংশ অভিভাবক। তাই ওই অঞ্চলগুলির স্কুলগুলিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পাঠ্যক্রমে নানা পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে নাচ, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি সৃজনশীল বিষয়কেও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাড়াতে গল্পভিত্তিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, ‘প্রারম্ভিক শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা’, ‘ভিত্তিমূলক সাক্ষরতা’, ‘সংখ্যা জ্ঞান ও সহযোগিতামূলক গল্পকথন’—এই বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে বিশেষ বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে। সেই বইয়ের পিডিএফ ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষকেরা পরীক্ষামূলক ভাবে শ্রেণিকক্ষে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দফতরে রিপোর্টও জমা দিয়েছেন। শিক্ষা দফতরের দাবি, সেই রিপোর্ট যথেষ্ট সন্তোষজনক। ফলে আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
এক আধিকারিকের কথায়, আজকের ব্যস্ত জীবনে বাড়িতে ছোটদের গল্প শোনানোর সময় অনেক পরিবারেই নেই। এতে শিশুদের মানসিক ও আবেগগত বিকাশ কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাই স্কুলেই গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করতে চান তাঁরা। শিক্ষকেরাও এই উদ্যোগে অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেই জানিয়েছে দফতর।







