এসআইআর বিতর্ক উল্টে দিল সমীকরণ! নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে মনোনিবেশ করল বাঙালি

ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক, রেকর্ড ৯৩% ভোটদান এবং বাড়তি ভোটারের অংশগ্রহণ— এই তিনের সমীকরণেই বাংলায় ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিল। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে যে ক্ষোভকে হাতিয়ার করে শাসক দল প্রচার চালিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ইস্যুই উল্টে গিয়ে বিজেপির পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলেছে। রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি এবং বদলে যাওয়া ভোটার তালিকার অঙ্ক— এই দুইয়ের মেলবন্ধনে রাজ্যে বিজেপি অভূতপূর্ব সাফল্যের মুখে, তৈরি হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার।

নির্বাচনের শুরু থেকেই এসআইআর ছিল রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু যোগ্য ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য ছিল, অবৈধ ও ভুয়ো নাম সরিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতেই এই উদ্যোগ। বাস্তবে দেখা গেল, এই ইস্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তাপ ভোটের দিন বিপুল অংশগ্রহণে রূপ নিল।

সংখ্যার অঙ্কও সেই চিত্রই তুলে ধরছে। সংশোধনের আগে রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি। খসড়া তালিকায় বাদ পড়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম, পরে আরও কাটছাঁট হয়। চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬.৪৪ কোটিতে। তবু ভোট পড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ— যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল নজির।

এই বিপুল ভোটদানের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল আশঙ্কা ও সচেতনতার মিশেলে তৈরি এক পরিবেশ। নাম বাদ পড়ার ভয়ে বহু পরিযায়ী শ্রমিক ও ভিন্‌রাজ্যে কর্মরত মানুষ রাজ্যে ফিরে এসে ভোট দিয়েছেন। ফলে ভোটার কমলেও ভোটদাতার সংখ্যা বেড়েছে লক্ষাধিক। দু’দফা মিলিয়ে প্রায় ৫১ লক্ষ ভোটার কম থাকলেও ভোট পড়েছে আগের তুলনায় প্রায় ৩১ লক্ষ বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত ভোটই ফলাফলে নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। সাধারণত বেশি ভোট পড়লে তা শাসকবিরোধী রায় নির্দেশ করে— এই প্রচলিত ধারণা এ বারও কার্যত সত্যি হল। যদিও তৃণমূল অতীতের উদাহরণ টেনে বলেছিল, বেশি ভোট মানেই তাদের বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু বাস্তবে সেই যুক্তি টিকল না।

এসআইআর-কে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতাও কম ছিল না। বহু নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় তত্ত্বাবধানে যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবু হাজার হাজার মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা বিরোধীরা প্রচারে জোর দিয়ে তুলে ধরে।

তবে নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে— এই ইস্যুতে জনমত তৃণমূলের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। বরং দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষ এবং পরিবর্তনের ইচ্ছাই প্রাধান্য পেয়েছে। জেলার পর জেলা, এমনকি শহুরে কেন্দ্রেও বিজেপির অগ্রগতি সেই বার্তাই দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এসআইআর শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া হয়ে থাকেনি— এটি হয়ে উঠেছে নির্বাচনের অন্যতম নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সেই সমীকরণে এবার বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত