১৫ বছরের শাসনের পতন—তৃণমূলের হারের নেপথ্যে কাজ করল পাঁচ বড় কারণ

প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া, ধর্মীয় মেরুকরণ, দুর্নীতি থেকে কর্মসংস্থানের সংকট—তৃণমূলের পরাজয়ের পেছনে একাধিক ফ্যাক্টরের জটিল সমীকরণ

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দীর্ঘ দেড় দশকের ক্ষমতার পর অবশেষে বদলের ঢেউ—পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, বরং জমে থাকা অসন্তোষ, কৌশলগত ভুল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মিলিত প্রতিফলন। বিজেপির উত্থানের পাশাপাশি শাসকদলের একাধিক দুর্বলতা এই ফলাফলে বড় ভূমিকা নিয়েছে, যা বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ—প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া। ২০১১ সালে যে ‘পরিবর্তন’-এর জোয়ারে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল, ১৫ বছর পর সেই একই মনোভাবই উল্টো স্রোত হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনিক ক্লান্তি, নিচুতলার সংগঠনে অসন্তোষ, এবং সিন্ডিকেট-সংস্কৃতি, কাটমানি বা দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভই ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘু ভোটের ভাঙন। গত কয়েক বছরে হিন্দুত্বের রাজনীতি বাংলায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা এবং সংঘাতের পরিবেশ সেই প্রবণতাকে আরও জোরদার করেছে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ভোট একজোট থাকেনি—আইএসএফ, কংগ্রেস, সিপিএমসহ একাধিক শক্তির মধ্যে বিভাজন তৃণমূলের ক্ষতি করেছে। ফলে বহু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাতেও বিজেপি অপ্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এসআইআর (Special Intensive Revision) নিয়ে বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে তৃণমূলের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে জোরালো হলেও, প্রচারের বড় অংশ জুড়ে শুধুই এই ইস্যুতে আটকে থাকা—উন্নয়ন বা ভবিষ্যৎ ভিশনের অভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে। ভোটারদের একাংশের কাছে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

চতুর্থত, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও সামাজিক ইস্যু। নিয়োগ দুর্নীতি, চাকরি বাতিল, বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ—এই সব বিষয় দীর্ঘদিন ধরে জনমানসে ক্ষোভ তৈরি করেছে। শিল্প বিনিয়োগের অভাব এবং স্থায়ী চাকরির সংকটও বড় ফ্যাক্টর। পাশাপাশি আরজি করের মতো ঘটনা মহিলা ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

পঞ্চম কারণ—বাঙালি অস্মিতার কৌশলের ভোঁতা হয়ে যাওয়া। ২০২১-এ যে ‘বাংলার গর্ব’ বার্তা কার্যকর ছিল, ২০২৬-এ তা আর তেমন কাজ করেনি। বিজেপি নিজস্ব কৌশলে ‘বহিরাগত’ তকমা অনেকটাই ঝেড়ে ফেলেছে—স্থানীয় নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক বার্তা এবং প্রচারে বদল এনে। ফলে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে।

এর পাশাপাশি সংগঠনের ভিতরে ভাঙন, তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থতা এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি—এই সবকিছু মিলিয়েই রাজ্যে পরিবর্তনের পালে হাওয়া জুগিয়েছে। ১৫ বছরের শাসনের পর এই ফলাফল তাই শুধু রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং ভোটারদের মনের পরিবর্তনেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত