বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের (Tiger Shroff) গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের নানা দিক। অভিনেতার সঙ্গে সলমন খানের (Salman Khan) ঘনিষ্ঠতার কথা হামলার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এলেও, পুলিশ এখনও সেই যোগসূত্র নিশ্চিত করেনি। রবিবার, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং গুজরাতের সুরাত থেকে উদ্ধার হয়েছে হামলায় ব্যবহৃত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০টি কার্তুজ।
১৮ অক্টোবর মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। ফুটবল খেলে ফেরার সময় অভিনেতার বিএমডব্লিউ (BMW) গাড়িতে গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। টাইগার অক্ষত থাকলেও তাঁর গাড়ির চালক এবং এক পথচারী আহত হন। ঘটনার পর থেকেই হামলার উদ্দেশ্য, অস্ত্রের জোগান এবং এর পিছনে কারা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ (Mumbai Police Crime Branch)।
টাইগার শ্রফের সঙ্গে সলমন খানের সম্পর্ককে হামলার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দাবি এখনও তদন্তে প্রমাণিত নয়। পুলিশের তরফে প্রকাশ্যে এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি যে, সলমনের সঙ্গে টাইগারের ঘনিষ্ঠতার কারণেই তাঁকে নিশানা করা হয়েছিল।
সলমন খানের নাম এর আগেও লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংকে (Lawrence Bishnoi gang) ঘিরে বিভিন্ন হুমকি ও অপরাধের খবরের সঙ্গে উঠে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে টাইগারের উপর হামলার ঘটনায় সলমন-যোগ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু অতীতের ঘটনা বা কোনও গোষ্ঠীর দাবি থেকে বর্তমান হামলার উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায় না।
এই মামলায় তদন্তকারীদের প্রধান কাজ হল, হামলার পরিকল্পনা কে করেছিল, হামলাকারীদের অস্ত্র কে জুগিয়েছিল এবং নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কারা যুক্ত ছিল, তার প্রমাণ সংগ্রহ করা। সলমন খানের সঙ্গে টাইগারের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত দাবির সত্যতাও সেই তদন্তের মধ্যেই যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলির একটি হল হামলায় ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুরাতের রেললাইনের কাছের ঝোপ থেকে একটি তুরস্কে তৈরি জিগানা পিস্তল (Zigana pistol), একটি দেশি পিস্তল এবং ১০টি জীবন্ত কার্তুজ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, পালানোর সময় অস্ত্রগুলি সেখানে ফেলে গিয়েছিল অভিযুক্তরা। উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। জুহুর ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খালি কার্তুজের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
এই অস্ত্র উদ্ধার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে হামলায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস এবং সরবরাহকারীদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
২৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর থেকে প্রাঞ্জল থাকরান (Pranjal Thakran) নামে ২২ বছর বয়সি এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের একটি সরবরাহের সঙ্গে তাঁর যোগ থাকতে পারে।
এই গ্রেফতারির পর মামলায় গ্রেফতার বা আটক হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ১১-তে পৌঁছেছে। তবে অভিযুক্তদের প্রত্যেকের ভূমিকা এক নয় বলে তদন্তে উঠে আসছে। কেউ সরাসরি গুলি চালানোর ঘটনায় অভিযুক্ত, আবার কারও বিরুদ্ধে অস্ত্র জোগাড়, যোগাযোগ বা অন্যান্য সহায়তার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাঞ্জল থাকরানের সঠিক ভূমিকা এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাঁর যোগ কতটা, তা জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। গ্রেফতার হওয়া মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
এনডিটিভির (NDTV) ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর তিন মূল অভিযুক্ত প্রথমে গুজরাতের সুরাত থেকে বাসে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। সেখান থেকে নেপালে পালানোর ছক ছিল বলে তদন্তকারীদের সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত বাস ছেড়ে যাওয়ার পর তারা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছয়। ফলে পরিকল্পনা বদলাতে হয়।
এরপর অভিযুক্তরা সুরাত রেলস্টেশন থেকে পুনে-জয়পুর এক্সপ্রেসে ওঠে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, ট্রেনে ওঠার আগে আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ সুরাতের বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে পুলিশ।
১৯ অক্টোবর রাজস্থানের কোটা স্টেশন থেকে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তদন্তে অস্ত্র সরবরাহ ও অন্য সহযোগীদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সামনে আসে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
হামলার পর সামাজিক মাধ্যমে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নামে দায় স্বীকারের একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সেই পোস্টে অনিল পণ্ডিত (Anil Pandit) নামে এক ব্যক্তির ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তবে পোস্টটির সত্যতা এবং গ্যাংয়ের প্রকৃত যোগসূত্র সম্পর্কে পুলিশি তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত গুরুত্ব পাবে।
মুম্বই পুলিশের তদন্তে অস্ত্রের উৎস, অভিযুক্তদের মধ্যে যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং হামলার পরিকল্পনা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। তদন্তকারীরা অন্য পরিচিত ব্যক্তিত্ব বা উচ্চ-নিরাপত্তার আবাসনকে লক্ষ্য করে নজরদারি করা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
টাইগার শ্রফের উপর হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনও নিশ্চিত নয়। সলমন খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে যে দাবি সামনে এসেছে, সেটিও প্রমাণের অপেক্ষায়। অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যই শেষ পর্যন্ত এই হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারবে।



