কোর্টকে নিঃশব্দে বিদায় সাইনার, হাঁটুর যন্ত্রণায় থামল এক যোদ্ধার লড়াই

হাঁটুর চোট ও আর্থারাইটিসের যন্ত্রণায় ব্যাডমিন্টন কোর্ট থেকে নিঃশব্দে সরে গেলেন সাইনা নেহওয়াল। কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই থামল এক ঐতিহাসিক কেরিয়ার।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ব্যাডমিন্টন কোর্টে আর ভেসে উঠবে না সেই চেনা দ্রুত ফুটওয়ার্ক, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা আক্রমণাত্মক ভঙ্গি। নিঃশব্দেই কোর্টকে বিদায় জানালেন ভারতের ব্যাডমিন্টনের এক যুগের মুখ—সাইনা নেহওয়াল। হাঁটুর অসহ্য যন্ত্রণার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হল এক সময়ের বিশ্বের এক নম্বর শাটলারকে।

২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক-এ ব্রোঞ্জ জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন সাইনা। দেশের ব্যাডমিন্টনকে বিশ্বমঞ্চে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চোট, বিশেষ করে হাঁটুর সমস্যা ধীরে ধীরে তাঁর কেরিয়ারকে গ্রাস করে। ২০২৩ সালের সিঙ্গাপুর ওপেনে শেষবার তাঁকে প্রতিযোগিতামূলক ব্যাডমিন্টনে দেখা গিয়েছিল।

সম্প্রতি একটি পডকাস্টে সাইনা নিজেই জানালেন, আসলে তিনি অনেক আগেই কোর্ট ছেড়ে দিয়েছেন। কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, কোনও বিদায়ী সংবর্ধনাও নয়। তাঁর কথায়,
“দু’বছর আগেই আমি খেলা ছেড়ে দিয়েছি। মনে হয়েছে, নিজের শর্তে এসেছি, নিজের শর্তেই চলে যাব। আলাদা করে ঘোষণা করার প্রয়োজন বোধ করিনি।”

সাইনার দর্শন ছিল স্পষ্ট—যদি খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে সরে যাওয়াই শ্রেয়। এক সময় যাঁর নামেই কাঁপত প্রতিপক্ষ, সেই সাইনাই অকপটে স্বীকার করেছেন, শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছিল না।

পডকাস্টে সাইনা জানান, তাঁর হাঁটুর কার্টিলেজ প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গিয়েছিল। আর্থারাইটিস ধরা পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কোর্টে নেমে আগের মতো খেলাই ছিল প্রায় অসম্ভব। তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ ভারী স্বীকারোক্তি—
“আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না।”

অন্য অনেক ক্রীড়াবিদের মতো সরকারি ভাবে অবসরের ঘোষণা না করে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার পথ বেছে নেন তিনি। সাইনার যুক্তি, সময়ই মানুষকে বুঝিয়ে দেবে যে তিনি আর খেলছেন না। “এক সময় সবাই বুঝে যাবে—সাইনা আর কোর্টে নামছে না,” বলেন তিনি।

বিশ্বের এক নম্বর হতে যে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, তা সাইনা হাড়ে হাড়ে জানেন। দিনের পর দিন আট-ন’ঘণ্টা অনুশীলন, শারীরিক ধকল, মানসিক চাপ—সব পেরিয়েই শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু আজ সেই শরীরই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“এখন এক-দু’ঘণ্টা অনুশীলন করলেই হাঁটু ফুলে যাচ্ছে। তার পরে আর চালিয়ে যাওয়া যায় না। তখনই মনে হয়েছিল—এবার থামতেই হবে,” বলেন সাইনা।

২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকের সময় থেকেই হাঁটুর চোট তাঁর কেরিয়ারকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। তবু ২০১৭ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ব্রোঞ্জ জেতেন। ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা এনে দেন দেশকে। ২০২৪ সালে তিনি প্রকাশ্যে জানান, তিনি আর্থারাইটিসে আক্রান্ত এবং হাঁটুর কার্টিলেজ ক্ষয়ে গিয়েছে।

যে সাইনাকে এক সময় কোর্টে ভয় পেতেন প্রতিপক্ষ, যাঁর ফুটওয়ার্ক ছিল পাঠ্যবইয়ের উদাহরণ—সেই সাইনাকেই আজ বলতে শোনা যায়,
“আমি আর পারছিলাম না।”
এই বাক্যেই যেন লুকিয়ে রইল এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের নিঃশব্দ সমাপ্তি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত