‘বাবার ছেলে প্রমাণ করতে না পারলেই বাংলাদেশি!’ আধার-প্যান থাকা সত্ত্বেও ডিটেনশন কেন? প্রশ্ন হাই কোর্টের

আধার-প্যান ও ভোটার কার্ড থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি সন্দেহে মুর্শিদাবাদের সাহিদুল শেখকে ডিটেনশন নিয়ে রাজ্যের বক্তব্যের ভিত্তি জানতে চাইল কলকাতা হাই কোর্ট।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আধার, প্যান এবং ভোটার পরিচয়পত্র রয়েছে। তবু মুর্শিদাবাদের সাহিদুল শেখকে বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে ডিটেনশন সেন্টারে রাখার ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাইল কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)। মৃত এক স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে বলে সাহিদুলের দাবি প্রমাণিত না হলেই কি তাঁকে বাংলাদেশি বলে ধরে নেওয়া যায়, শুনানিতে সেই প্রশ্নও তুলেছে আদালত। আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া নির্বাসনের নির্দেশ কার্যকর না রাখার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

মামলাটি উঠেছিল বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের (Justice Saugata Bhattacharyya) এজলাসে। সাহিদুলের বিরুদ্ধে বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন আধিকারিক (Foreigners Regional Registration Officer বা FRRO) ডিটেনশন এবং নির্বাসনের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। রাজ্যের বক্তব্য, সাহিদুল বাংলাদেশ থেকে বেআইনি ভাবে ভারতে ঢুকে পরে স্থানীয় এক মৃত ব্যক্তির ছেলে পরিচয় ব্যবহার করে ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে সেই দাবির ভিত্তি নিয়েই আদালতে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।

শুনানিতে আদালত জানতে চায়, সাহিদুলকে ঠিক কোন ভিত্তিতে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হল। তাঁর কাছে আধার, ভোটার পরিচয়পত্র এবং প্যান কার্ড থাকার বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে। রাজ্যের দাবি, ওই নথিগুলি জাল বা ভুয়ো পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আদালতের প্রশ্ন ছিল, সেই নথির বৈধতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেই কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়?

মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল সাহিদুলের পারিবারিক পরিচয়। রাজ্যের তরফে আদালতে বলা হয়, সাহিদুল যাঁদের নিজের পরিবারের সদস্য বলে দাবি করেছেন, তাঁদের কয়েক জন নাকি তাঁকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন। এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই আদালত জানতে চায়, কোনও ব্যক্তি যে পরিবারকে নিজের পরিবার বলে দাবি করছেন, সেই পরিবারের সদস্যেরা তাঁকে স্বীকার না করলেই কি প্রমাণ হয়ে যায় যে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক? আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

সাহিদুলের পরিবারের অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। তাঁদের বক্তব্য, তিনি মুর্শিদাবাদেরই বাসিন্দা এবং তাঁর কাছে ভোটার কার্ড, আধার, প্যান, রেশন কার্ড, জমির নথি-সহ একাধিক পরিচয় ও সম্পত্তি সংক্রান্ত কাগজ রয়েছে। পরিবারের আইনজীবীর দাবি, ২০২৬ সালের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision)-এর সময়ও তাঁর নাম যাচাই করে তালিকায় রাখা হয়েছিল। চলতি বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথাও আদালতে জানানো হয়েছে।

এর আগে মামলার শুনানিতে সাহিদুলের স্ত্রী দেজিনা বিবি জানিয়েছিলেন, ৮ অগস্ট রাতে রানিনগর থানার পুলিশ তাঁর স্বামীকে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তিনি বিদেশি আঞ্চলিক নিবন্ধন আধিকারিকের হেফাজতে রয়েছেন বলে পরিবার আদালতে জানায়। পরিবারের অভিযোগ ছিল, আটক বা গ্রেফতারের যথাযথ নথিও তাঁদের হাতে দেওয়া হয়নি। এই অভিযোগের পর আদালত রাজ্যের কাছে ডিটেনশন বা অ্যারেস্ট মেমো এবং আটকের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে রিপোর্ট চেয়েছিল।

রাজ্যের আইনজীবীর বক্তব্য, সাহিদুল নিজেই বাংলাদেশ থেকে বেআইনি ভাবে ভারতে প্রবেশের কথা স্বীকার করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরে মৃত এক স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে পরিচয় দিয়ে ভারতীয় নথি তৈরি করা হয়। তবে আগের শুনানিতেই আদালত জানতে চেয়েছিল, কথিত ওই স্বীকারোক্তি কার সামনে দেওয়া হয়েছিল—পুলিশের কাছে, না কি বিদেশি নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে। সেই জায়গাটি নিয়েও স্পষ্টতা চাওয়া হয়েছিল।

৮ অক্টোবরের শুনানিতে মামলাটি আরও বড় প্রশ্নের দিকে যায়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে কত মানুষ ভারতে এসেছিলেন, রাজ্যের আইনজীবীর কাছে তা জানতে চান বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। সেই সময় সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রত্যেককে এখন চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো বাস্তবে সম্ভব কি না, আদালত সেই প্রশ্নও তোলে। সীমান্তবর্তী জেলার বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে সেখানে যাওয়ার কথাও শুনানিতে বলেন বিচারপতি।

তবে আদালত এই পর্যায়ে সাহিদুলকে ভারতীয় নাগরিক বলে ঘোষণা করেনি। একই ভাবে রাজ্যের অভিযোগও আদালত চূড়ান্ত ভাবে গ্রহণ করেনি। বরং নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া এবং তাঁকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করার আগে প্রক্রিয়াটি যথাযথ কি না, সেই প্রশ্নই শুনানির কেন্দ্রে রয়েছে।

রাজ্যের আইনজীবী এ দিন মামলাটি অন্য উপযুক্ত বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন করেন। এরপর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য মামলাটি তাঁর এজলাস থেকে ছেড়ে দেন এবং উপযুক্ত বেঞ্চে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আগামী ১৪ অক্টোবর মামলাটি ফের শুনানির জন্য ওঠার কথা। তত দিন সাহিদুলের বিরুদ্ধে জারি হওয়া নির্বাসনের নির্দেশ কার্যকর থাকবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু সাহিদুল শেখ ভারতীয় না বাংলাদেশি—সেটি নয়। তাঁকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের হাতে ঠিক কী নথি রয়েছে, আধার-প্যান-ভোটার পরিচয়পত্র নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর কী, কথিত স্বীকারোক্তির ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য এবং তাঁকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—পরবর্তী শুনানিতে এই বিষয়গুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্য এখনও হয়নি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন