রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই দলের ‘তৃণমূলীকরণ’ ঠেকানোর বার্তা দিয়েছিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya)। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরই প্রাক্তন তিন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক রাজ্যসভার টিকিট পাওয়ায় সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই আবহেই এ বার গেরুয়া শিবিরকে সতর্ক করল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর মুখপত্র ‘স্বস্তিকা’। দলের নিচুতলা থেকে উপরতলা—সর্বস্তরে সংগঠন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
‘স্বস্তিকা’র সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে বিজেপির সামনে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি জনমানসে দলের ভাবমূর্তি নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ বিজেপিকে ভরসা করে রাজ্যে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু ভোটারদের একটা অংশ যদি মনে করেন, বিজেপি দীর্ঘদিনের শাসক দলেরই অন্য রূপ, তা হলে সেই আস্থার জায়গা দ্রুত নষ্ট হতে পারে।
সম্পাদকীয়তে কার্যত সতর্ক করে বলা হয়েছে, মাত্র ২ শতাংশ মানুষ বা ভোটারের মধ্যেও যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে বিজেপি ১৫ বছর ধরে চলা ‘তস্কর’ সরকারেরই অন্য পিঠ, তা হলে ৯০ শতাংশ ভোটার বিজেপির থেকে সরে যেতে দ্বিধা করবেন না। তাই সাধারণ মানুষের ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া নতুন সরকারের কাছে অত্যন্ত জরুরি বলেই মত প্রকাশ করেছে সংঘের মুখপত্র।
রাজ্যের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নতুন সরকারকে সাবধানে এগোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ‘স্বস্তিকা’র সম্পাদকীয়তে আগের শাসনপর্বের বিরুদ্ধে সমাজবিরোধিতা ও তোলাবাজির অভিযোগ তুলে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের কার্যকলাপ কার্যত রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেয়েছে।
ধানতলা, বানতলা, নেতাই, নন্দীগ্রাম, কেশপুর থেকে শুরু করে মোথাবাড়ি, মুর্শিদাবাদ, সন্দেশখালি এবং আরজি করের অভয়াকাণ্ডের মতো একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা কোনও না কোনও ভাবে রেহাই পেয়েছেন। সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েই নতুন সরকারকে প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তবে সংঘের মুখপত্রের মতে, বিজেপির সামনে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিসর যথেষ্ট বড়। দীর্ঘদিনের শাসক দলের সংগঠন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করে সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, বাম ও কংগ্রেসও রাজনৈতিক ভাবে অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে। ফলে বিজেপির সামনে এই মুহূর্তে বড় কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাধা নেই।
কিন্তু সেই সুযোগের মধ্যেই রয়েছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—জনগণের মুখোমুখি হওয়া। ‘স্বস্তিকা’র বক্তব্য, অন্য দলের বাড়বাড়ন্তের ভয় নয়, মানুষের প্রত্যাশা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াই এখন বিজেপির কাছে বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে সরকারের কাজকর্ম এবং দলের আচরণ—দু’দিকেই সাধারণ মানুষের আস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দলের অন্দরে অবশ্য ‘বেনোজল’ ঢোকা নিয়ে উদ্বেগ আগেই প্রকাশ্যে এসেছে। নিচুতলায় তোলাবাজি এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে সরব হয়েছেন খোদ শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্যেও বিজেপির সংগঠনের চরিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে।
তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ বা দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনাগুলিও সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদদের রাজ্যসভার টিকিট পাওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপি কি আদৌ নিজেদের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে?
এই পরিস্থিতিতে বিজেপির অন্দরে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সাংগঠনিক বদলের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। নেতৃত্বের একাংশের আশঙ্কা, ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন দল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের বড় অংশকে সংগঠনে জায়গা দিতে গিয়ে দলের নিজস্ব আদর্শ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনও পরিবর্তন যেন না আসে। আরএসএসের মুখপত্রের সতর্কবার্তায় সেই উদ্বেগই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।



