পর্ন ভিডিয়োর লোভ দেখিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ঢুকছে ভয়ঙ্কর ম্যালঅয়্যার। এক বার এই ধরনের অ্যাপ ইনস্টল করলেই ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে সাইবার প্রতারকদের হাতে। শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, ফোনের স্ক্রিনে নজর রাখা, ওটিপি-পিন হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে দেওয়ার মতো প্রতারণাও সম্ভব। এই ধরনের ক্ষতিকারক অ্যাপ নিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের সতর্ক করেছে কেন্দ্রের অধীনস্থ ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম থ্রেট অ্যানালিটিক্স ইউনিট (NCTAU)। প্রকাশ করা হয়েছে সন্দেহজনক অ্যাপের তালিকাও।
তালিকায় রয়েছে ‘নাইট প্লে’, ‘রিলুপ’, ‘কিস’, ‘ভিমো’, ‘রিভো’, ‘নেক্সো’ এবং ‘ভিক্সা’-র মতো একাধিক অ্যাপ। কেন্দ্রীয় সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই অ্যাপগুলি সাধারণত পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের ফোনে ঢোকার চেষ্টা করে। এক বার ফোনে জায়গা করে নিলে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আর্থিক প্রতারণার পথও খুলে যায়।
সবচেয়ে বড় বিপদ শুরু হয় এই অ্যাপগুলি কী ভাবে ফোনে ঢুকছে, সেখান থেকেই। ফেসবুক (Facebook) এবং ইনস্টাগ্রাম (Instagram)-এর মতো সমাজমাধ্যমে উত্তেজক ছবি বা ভিডিয়োর অংশ দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের ওয়েবসাইটে। সেখান থেকেই অ্যাপ ডাউনলোড করার প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে।
এই অ্যাপগুলির আরও একটি বড় বিপদ হল, এগুলি সাধারণত গুগ্ল প্লে স্টোরে পাওয়া যায় না। ব্রাউজ়ারের মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন প্যাকেজ বা APK ফাইল ডাউনলোড করিয়ে ফোনে ইনস্টল করা হয়। ফলে ব্যবহারকারী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তিনি একটি যাচাই না-করা সফ্টঅয়্যারকে ফোনে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন।
অ্যাপটি ইনস্টল হওয়ার পরেই শুরু হয় আসল ফাঁদ। ফোনে ঢোকার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুমতি চাওয়া হয়। ব্যবহারকারী সেই অনুমতিগুলি দিয়ে দিলেই ক্ষতিকারক সফ্টওয়্যার ফোনের বিভিন্ন ফিচারে প্রবেশের সুযোগ পায়। এমনকি স্ক্রিনে কী হচ্ছে তা দেখা এবং ওটিপি বা পিন সংগ্রহ করাও সম্ভব হতে পারে।
২৬ আগস্টের সতর্কবার্তায় NCTAU জানিয়েছে, এই ম্যালঅয়্যার অতিরিক্ত অ্যাপ ইনস্টল করার অনুমতি চাইতে পারে। পাশাপাশি অ্যান্ড্রয়েডের ‘Accessibility’ ফিচারের অপব্যবহার করে ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী এক বার প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনুমতি দিলেই সাইবার প্রতারকদের হাতে ফোনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার কৌশল আরও জটিল। অ্যাপটি আপডেট হওয়ার নাম করে দ্বিতীয় একটি প্যাকেজ ফোনে ডাউনলোড করাতে পারে। পরে সেই সফ্টওয়্যার আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। ‘Accessibility Permission’ চালু হয়ে গেলে ক্ষতিকারক অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে পারে এবং ডিভাইসের উপর নজরদারি চালানোর সুযোগ পায়।
NCTAU আরও জানিয়েছে, কয়েকটি অ্যাপ ভিপিএন ইনস্টল করতে পারে। এর ফলে ফোনের ইন্টারনেট ট্র্যাফিক হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন সার্ভারের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। অর্থাৎ ফোন থেকে ইন্টারনেটে যে তথ্য আদানপ্রদান হচ্ছে, তার নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে সমাজমাধ্যমে দেওয়া একটি ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার পরই।
সাইবার সংস্থার প্রকাশিত গ্রাফিকে পুরো প্রতারণার প্রক্রিয়াটিও দেখানো হয়েছে। প্রথমে সমাজমাধ্যমে ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন, সেখান থেকে ফিশিং ওয়েবসাইট, তারপর APK ফাইল ডাউনলোড এবং ইনস্টল—এর পর ‘Accessibility’ অনুমতি হাতিয়ে নিয়ে ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে ম্যালঅয়্যার। শেষ ধাপে শুরু হতে পারে আর্থিক প্রতারণা।
এই পরিস্থিতিতে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য কেন্দ্রের পরামর্শ, শুধুমাত্র গুগ্ল প্লে স্টোর বা বিশ্বস্ত অ্যাপ স্টোর থেকেই অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। কোনও বিজ্ঞাপন, সন্দেহজনক ওয়েবসাইট বা অচেনা লিঙ্ক থেকে APK ফাইল ডাউনলোড না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অজানা অ্যাপকে ‘Accessibility’ অনুমতিও দেওয়া উচিত নয়।
পাশাপাশি ফোনে ‘Google Play Protect’ চালু রাখা এবং অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস নিয়মিত আপডেট করার পরামর্শ রয়েছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও UPI লেনদেনেও নজর রাখতে বলা হয়েছে। কোনও অপরিচিত অ্যাপ বা সন্দেহজনক সফ্টওয়্যার ফোনে রয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
ইতিমধ্যেই যদি কোনও ফোন এই ম্যালঅয়্যারে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তা হলে সেটিকে ‘Safe Mode’-এ রিস্টার্ট করে সন্দেহজনক অ্যাপ আনইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে NCTAU। প্রয়োজনে ওই অ্যাপের Accessibility Permission বন্ধ করতে হবে এবং Device Administrator-এর কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া থাকলে তা বাতিল করতে হবে।
অ্যাপটি কিছুতেই সরানো না গেলে বা ফোন রিস্টার্ট করার পরেও সেটি ফিরে এলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ নিয়ে ফ্যাক্টরি রিসেট করার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। একই সঙ্গে কোনও প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত ১৯৩০ নম্বরে ফোন করে অথবা cybercrime.gov.in-এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু পর্ন কনটেন্ট দেখার লোভেই অচেনা অ্যাপ ফোনে ঢোকানো কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, এই সতর্কবার্তায় সেটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে কেন্দ্র। বিশেষ করে সমাজমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে APK ডাউনলোড করার আগে সতর্ক না হলে ব্যক্তিগত তথ্য থেকে ব্যাঙ্কের টাকা—দু’টিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।



