একই খাবার দিনের অন্য সময়ে খেলে রক্তে শর্করা যতটা বাড়ে, রাতে ঘুমের ঠিক আগে খেলে অনেক ক্ষেত্রে তার তুলনায় বেশি বাড়তে পারে। এর অন্যতম কারণ শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm)। দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা কমে যায়। তার সঙ্গে রাতে শারীরিক সক্রিয়তা কম থাকায় খাবার থেকে তৈরি গ্লুকোজ় দ্রুত ব্যবহার হতে পারে না। ফলে ডিনার দেরি হলে খাবারের পর ব্লাড সুগার বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
শরীরের নিজস্ব ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। সকাল ও বিকেলে শরীরের কোষ সাধারণত ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল থাকে। দিনের শেষভাগে সেই সংবেদনশীলতা কমতে থাকায় একই খাবার রাতে খেলে রক্তে গ্লুকোজ়ের মাত্রা তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। রাতের খাবারের পর সাধারণত আমরা বিশ্রাম নিই বা ঘুমের প্রস্তুতি শুরু করি। ফলে পেশির গ্লুকোজ় ব্যবহারের মাত্রা কমে যায়। এই দুই কারণ মিলেই রাতে খাওয়ার পর ব্লাড সুগার বেশি সময় ধরে উঁচু থাকতে পারে।
তবে শুধু খাবারের সময় নয়, কী খাচ্ছেন সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন, ফাইবার এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবার তুলনামূলক ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। বিপরীতে মিষ্টি ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার দ্রুত শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিয়মিত রাত করে খাওয়ার অভ্যাস নিয়েও সতর্ক হওয়ার কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন অনিয়মিত সময়ে খাওয়া, বিশেষ করে রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ওজন বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় সমস্যার যোগসূত্র পাওয়া যায়। ফলে যাঁদের ইতিমধ্যেই প্রি-ডায়াবিটিস বা ডায়াবিটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারের সময়ের দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্থূলতা, মেটাবলিক সিন্ড্রোম বা PCOS-এর মতো সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদেরও রাতের খাবারের সময় ও ধরন নিয়ে সচেতন থাকা উচিত। একই ভাবে নাইট শিফটে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শরীরের স্বাভাবিক সার্কাডিয়ান রিদমের সঙ্গে খাবারের সময়ের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ঘুমোতে যাওয়ার অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা ভালো অভ্যাস। একেবারে শোওয়ার আগে ভরপেট খাওয়ার বদলে পরিমিত ও সুষম খাবার বেছে নেওয়া শরীরের জন্য বেশি উপযোগী।
ডিনারের পর ১০ থেকে ২০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটিও উপকারী হতে পারে। এতে পেশি রক্তে থাকা কিছু অতিরিক্ত গ্লুকোজ় শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
রাতে দেরি হয়ে গেলে ভারী খাবার, মিষ্টি এবং অতিরিক্ত রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট এড়ানো ভালো। সাদা ভাত বা ময়দাজাতীয় খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ হালকা খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। সারা দিন না খেয়ে রাতে একসঙ্গে অনেকটা খাওয়াও এড়ানো উচিত।
অর্থাৎ, শুধু কী খাবেন নয়, কখন খাবেন—ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডায়াবিটিস বা প্রি-ডায়াবিটিস থাকলে নিয়মিত খাবারের সময় বজায় রাখা, ঘুমের আগে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখা এবং খাবারের পর হালকা হাঁটার মতো অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।



