নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১০৫০, এখনও নিখোঁজ প্রায় ৪০০০, ভারতীয়দের নিয়েও উদ্বেগ

নেপালে ২৬ অগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০৫০। প্রায় ৪০০০ নিখোঁজ। মৃতদেহ শনাক্ত ও দেশে ফেরাতে ভারতীয় দূতাবাস জানাল ন’টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

২৬ অগস্টের ভয়াবহ হড়পা বান ও হিমবাহ ধসের পর সপ্তম দিনেও স্বাভাবিক হয়নি নেপাল। মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৫০। প্রায় ৪,০০০ মানুষের এখনও কোনও খোঁজ নেই। নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার মানুষকে এখনও পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে অভিযান চলছে জোরকদমে।

বিপর্যয়ের পর উদ্ধার হওয়া মৃতদেহ শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু দেহ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় নাগরিকদের মৃতদেহ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে মঙ্গলবার বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস। নেপাল সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, মৃতদেহ হস্তান্তর ও দেশে ফেরানোর জন্য মোট ন’টি ধাপ রয়েছে। প্রথমে দেহের নথিভুক্তকরণ এবং ছবি ও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তার পর ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতকরণ এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

এর পর আঙুলের ছাপ, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ, মৃতের পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র যাচাই, দূতাবাসের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় এবং শেষে হস্তান্তর সংক্রান্ত মেমো ও রসিদ তৈরি করা হবে। প্রথম চারটি ধাপ নেপালের প্রশাসনই সম্পন্ন করবে বলে জানিয়েছে ভারতীয় দূতাবাস।

নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের ছবি ও বিবরণ প্রকাশ করা হচ্ছে। কোনও পরিবার সেখানে তাঁদের স্বজনকে শনাক্ত করতে পারলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। শনাক্ত করা সম্ভব না হলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক অশনাক্ত মৃতদেহ সাময়িক ভাবে সমাহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় দূতাবাস।

এ দিকে নিখোঁজদের সন্ধানে এখনও তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গে আটকে থাকা কর্মীদের নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। বহু সুড়ঙ্গ কাদা ও ধ্বংসস্তূপে পুরোপুরি ভরে যাওয়ায় সেখানে থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করেও জীবিত মানুষের উপস্থিতির সন্ধান পাওয়া কঠিন হচ্ছে। প্রায় ৯০০ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্মীর কোনও হদিস নেই বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উঠে এসেছে।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে বহু পরিবার এখনও দুর্গত এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নেপালের কয়েকটি পরিবার নিখোঁজ আত্মীয়দের প্রতীকী শেষকৃত্যও করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উঠে এসেছে। তবে উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিখোঁজদের বিষয়ে আশা ছাড়ছে না প্রশাসন।

বিপর্যয়ের ভয়াবহতা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। নেপাল সরকার আন্তর্জাতিক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে জরুরি আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে নেপালের সরকারি সূত্রে অনুমান করা হয়েছে।

নেপালের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মহেশ্বর ধাকাল দাবি করেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই বিপর্যয়ের পরিস্থিতি আরও তীব্র করেছে। তবে বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ এখনও সম্পূর্ণ ভাবে নির্ধারিত হয়নি বলে নেপাল সরকারের বিদেশ মন্ত্রকও জানিয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণায়ন, হিমবাহের পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

এখনও চলছে উদ্ধার ও শনাক্তকরণের কাজ। একদিকে হাজারের বেশি প্রাণহানি, অন্যদিকে প্রায় চার হাজার নিখোঁজ—নেপালের সামনে আপাতত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিখোঁজদের সন্ধান এবং অশনাক্ত মৃতদেহগুলির পরিচয় নিশ্চিত করা। ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের নতুন নির্দেশিকা সেই প্রক্রিয়াকে কিছুটা স্পষ্ট করলেও, বহু পরিবারের অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন