প্রকৃতির ভয়াবহ তাণ্ডবে কার্যত বিপর্যস্ত নেপাল। সরকারি হিসাবে এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৬২, নিখোঁজ অন্তত ৭৫০ জন। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ১৩৩ জন ভারতীয়ও। বুধবারের এই ভয়াবহ হড়পা বান কেন এতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠল, তা নিয়ে প্রথম থেকেই নানা তত্ত্ব সামনে আসছিল। প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS)-এর সংশোধিত মূল্যায়নে উঠে এসেছে অন্য তথ্য।
দুর্যোগের পর প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল, নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সেই কম্পনের পরই হড়পা বানের সূত্রপাত বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু পরে ভূকম্পন সংক্রান্ত তথ্য, সিসমিক তরঙ্গ এবং উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে নিজেদের মূল্যায়ন সংশোধন করে ইউএসজিএস।
সংশোধিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই কম্পন সাধারণ ভূমিকম্পের কারণে তৈরি হয়নি। বরং পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসের ফলেই এই কম্পনের মতো সিগন্যাল তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছে মার্কিন সংস্থাটি। সংশোধিত হিসাবে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.২। অর্থাৎ বিপর্যয়ের মূল সূত্র খুঁজতে গেলে নজর যাচ্ছে হিমবাহ ধসের দিকেই।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের সময় বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ আচমকা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথে সেই বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর আটকে গেলে তৈরি হয় একটি অস্থায়ী বাধা। এরপর জমতে থাকা জলের চাপ যখন সেই বাধা ভেঙে দেয়, তখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নীচের দিকে নেমে আসে জল, কাদা, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত।
এই প্রবল স্রোতই মুহূর্তের মধ্যে নদী ও উপত্যকার নীচের জনবসতিগুলিতে আছড়ে পড়ে। ফলে সাধারণ বন্যার তুলনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ইউএসজিএসও জানিয়েছে, হিমবাহ ধসের জেরে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর নীচে নেমে আকস্মিক জলস্রোত তৈরি করে। সেই স্রোতই উপত্যকার নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংস ডেকে আনে।
নেপালের কাঠমান্ডু-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD)-এর গবেষকরাও নদীর জলস্তরের আচরণকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। এত অল্প সময়ে জলস্তরের এমন উল্লম্ফন আকস্মিক এবং অত্যন্ত শক্তিশালী জলস্রোতেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যালের বক্তব্যেও একই কারণ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, গত ১৪ মাসে লেন্ডে খোলা নদীতে দু’বার বন্যা হয়েছে। তবে এবারের বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে মূল কারণ হিমবাহ ধস। তাঁর ব্যাখ্যায়, হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফ ও পাথর নদীর গতিপথ আটকে দেওয়ায় জল জমতে থাকে। পরে অতিরিক্ত জলের চাপে সেই বাধা ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি হয়।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একাংশও হিমবাহ ধসকেই এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। পাহাড়ি অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং ভূপ্রকৃতিগত অস্থিরতার কারণে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা।
ফলে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পকে সরাসরি মূল কারণ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা আপাতত অনেকটাই পিছনে চলে গিয়েছে। বরং হিমবাহ ধস, নদীর গতিপথে সাময়িক অবরোধ এবং সেই বাধা ভেঙে সৃষ্ট প্রবল জলস্রোতের ধারাবাহিক ঘটনাকেই ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকাজ যত এগোবে, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও তত স্পষ্ট হবে।



