প্রায় ১২ বছর ধরে আটকে থাকা রোজভ্যালির টাকা ফেরার সম্ভাবনা নতুন করে তৈরি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে কলকাতা হাই কোর্টে বড় প্রস্তাব দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের প্রস্তাব, রোজভ্যালির ২১টি হোটেল-সহ সমস্ত সম্পত্তি এক বছরের মধ্যে বিক্রি করে সেই অর্থ আমানতকারীদের মধ্যে ফেরত দেওয়া হোক। পুরো প্রক্রিয়াটি কলকাতা হাই কোর্টের নজরদারিতে চালানোরও আবেদন জানিয়েছে রাজ্য।
হাই কোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্যের মুখ্যসচিবের তরফে একটি রিপোর্ট জমা দিয়ে এই প্রস্তাব জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সম্পত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর পথ অনেকটাই সহজ হবে।
রোজভ্যালি চিটফান্ড কাণ্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের সঞ্চয়ের টাকা হারিয়েছেন বলে অভিযোগ। প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার এই আর্থিক কেলেঙ্কারির পর বহু বছর কেটে গেলেও অধিকাংশ আমানতকারী এখনও তাঁদের পুরো অর্থ ফেরত পাননি। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের নতুন প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এতদিন রোজভ্যালির বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা ফেরানোর দায়িত্ব ছিল হাই কোর্ট নিযুক্ত অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটির উপর। কিন্তু সেই কমিটির কার্যকলাপ নিয়েই এ বার প্রশ্ন উঠেছে। স্টেট ফিনান্সিয়াল ইনভেস্টিগেশন অফিস বা SFIO-র তরফে কমিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে রাজ্যের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বর্তমান অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটি ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে রাজ্য সরকার। পরিবর্তে আদালতের সরাসরি নজরদারিতে রাজ্যের মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া চালানোর আবেদন জানানো হয়েছে।
রাজ্যের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোজভ্যালির ২১টি হোটেল ছাড়াও যে সমস্ত সম্পত্তি এখনও বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলিও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। সম্পত্তি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুরো কাজটি এক বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যও আদালতের সামনে তুলে ধরেছে সরকার।
রোজভ্যালি মামলায় এর আগে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিও একাধিক পদক্ষেপ করেছিল। ২০১৫ সালের মার্চে রোজভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুণ্ডুকে গ্রেফতার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। পরে তাঁর স্ত্রী শুভ্রা কুণ্ডুকেও গ্রেফতার করে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)। মামলার তদন্তে রোজভ্যালির একাধিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সেই সম্পত্তি বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরানোর উদ্দেশ্যে অ্যাসেট ডিসপোজাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সম্পত্তি নিষ্পত্তি ও টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে আমানতকারীদের।
এ বার রাজ্য সরকারের প্রস্তাব আদালত কতটা গ্রহণ করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাই কোর্টের অনুমোদন মিললে সম্পত্তি বিক্রি এবং টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসতে পারে। তবে প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার আগে আদালতের নির্দেশ এবং সম্পত্তি বিক্রির আইনি প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত পথ নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘ এক যুগ ধরে টাকা ফেরতের অপেক্ষায় থাকা রোজভ্যালির আমানতকারীদের কাছে তাই হাই কোর্টে রাজ্যের এই প্রস্তাব নতুন আশার খবর। এক বছরের সময়সীমার মধ্যে সম্পত্তি বিক্রি করে সত্যিই কত দ্রুত টাকা ফেরানো সম্ভব হয়, এখন সেই দিকেই নজর থাকবে আমানতকারী থেকে শুরু করে আদালত—সবার।



