ভারি বৃষ্টিতে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তৈরি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। বৃহস্পতিবার সবংয়ে পৌঁছে আকাশপথে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পরে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে একাধিক নির্দেশ দেন তিনি। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বন্যায় মৃত দুই পরিবারের প্রত্যেককে ৯ লক্ষ টাকা করে এবং সবং ব্লকের ৩২০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে।
রবিবার থেকেই পশ্চিম মেদিনীপুরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। সোমবার ভারী বৃষ্টির পর মঙ্গলবারও দফায় দফায় বৃষ্টি চলতে থাকে। এর জেরে কেলেঘাই-সহ একাধিক নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়ে। কোথাও নদীর জল বিপদসীমা, কোথাও আবার চরম বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় জল ঢুকে পড়ে একাধিক জনবসতিতে।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সবংয়ে পৌঁছে আকাশপথে পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে ত্রাণ, পানীয় জল, খাদ্য সরবরাহ এবং দুর্গতদের বাড়ি ফেরানোর বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন্যায় সবংয়ে এখনও পর্যন্ত দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি, শুধুমাত্র সবং ব্লকেই ৩২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে বৃহস্পতিবার কেলেঘাই নদীর জলস্তর কিছুটা কমেছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নদীর জল এখন বিপদসীমার নীচে নেমে এসেছে। যে সমস্ত মানুষ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের পাঁচ দিনের রেশন দিয়ে বাড়ি ফেরানো হয়েছে।
জলবন্দি মানুষের কাছে খাবার ও পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশকে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা দুর্গতদের বাড়িতে রেশন এবং ২০ লিটারের পানীয় জলের জার পৌঁছে দিতে পারে।
বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি সাপের কামড়ের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এলাকায় এখনও পর্যন্ত সাপে কাটার ১০টি ঘটনা সামনে এসেছে। প্রত্যেক আক্রান্তকে চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলে দাবি তাঁর। স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্যও বৃহস্পতিবার থেকে প্রধানমন্ত্রী শস্যবিমা যোজনার শিবির শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ধানচাষিরা এই শিবিরে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন। তবে মাদুরকাঠি চাষ শস্যবিমার আওতায় না থাকায় তাঁদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সবং সফরে এসে পূর্ববর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও আক্রমণ শানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী সবংয়ের মতো গ্রামীণ এলাকায় এসে বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুর্গত এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের নজরদারি বজায় রাখার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী রাজেশ মাহাতোকে (Rajesh Mahato) সবংয়ে রেখে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। আগামী দু’দিন তিনি এলাকায় থেকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ দেখবেন। ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি ফেরানো এবং শস্যবিমার তালিকা তৈরির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নজরদারি চলবে বলে জানানো হয়েছে।
সবংয়ের পর আরামবাগে যাওয়ার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। সেখানে সরাসরি বন্যা না হলেও ডিভিসি (DVC) থেকে জল ছাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে কী ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে পর্যালোচনা করবেন তিনি। এরপর তাঁর উত্তরবঙ্গে যাওয়ার কথা রয়েছে। বাগডোগরায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ঘিরেও তাঁর কর্মসূচি রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ক্ষয়ক্ষতির ছবি এখনও উদ্বেগজনক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে আর্থিক সাহায্য পৌঁছনো, কৃষকদের শস্যবিমার আওতায় আনা এবং দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও পানীয় জলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।



