মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল অগ্নিকাণ্ডে আগুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল বিষাক্ত ধোঁয়া। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তিনতলার রিসেপশন এলাকায় এসির তার বা পোর্টের অংশে অস্বাভাবিকতা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দ্রুত বৈদ্যুতিক তারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায় ভবনের একাধিক অংশ। সেই ধোঁয়াতেই দমবন্ধ হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
১৯ অগস্ট গভীর রাতে নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন (Shikha Inn)-এ ভয়াবহ আগুন লাগে। পাঁচতলা ভবনটির ভিতরে তখন বহু আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ঢুকে যায় ঘরগুলিতে। অনেকেই ঘুমের মধ্যেই শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় আরও অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন।
ফরেনসিকের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, তিনতলার রিসেপশন সংলগ্ন এলাকায় এসির তার বা পোর্টে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এসি বসানো জায়গার একটি অংশ ফুলে ওঠার চিহ্নও মিলেছে। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা। আগুনের তাপে আশপাশের বৈদ্যুতিক তারগুলিও ফাটতে শুরু করে বলে জানা গিয়েছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে ধোঁয়ার কারণে। আগুনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া কালো ও বিষাক্ত ধোঁয়া ভবনের ঘরগুলিতে ঢুকে পড়ে। সরু সিঁড়ি, সীমিত বেরোনোর পথ এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক আবাসিক দ্রুত বাইরে বেরোতে পারেননি। এই ধরনের নিরাপত্তা ঘাটতিই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে ওই হোটেলে উঠেছিলেন কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত (Debashish Dutta), তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (Afsana Shimmin), তাঁদের ছোট সন্তান এবং পরিবারের আরও এক সদস্য ছিলেন। আগুনের সময় পরিবারের সদস্যরা বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
হোটেলের রিসেপশনের পাশের ঘরে ছিলেন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সন্দীপ পাসোয়ান (Sandeep Paswan)। তিনিও ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে। আগুনের মধ্যে ঠিক কী ভাবে সেই আঘাত লাগে, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
বুধবার সব দেহের শনাক্তকরণ সম্পূর্ণ না হওয়ায় ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার দেহগুলির ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল হাতে এলে মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার ধরন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেলের লিজ হোল্ডার আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)। ম্যানেজার এবং এক কর্মীকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পলাতক মালিকের সন্ধানেও তল্লাশি শুরু হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুমোদিত নির্মাণ এবং হোটেল পরিচালনায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আবাসিকদের একাংশের দাবি, সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। পাঁচতলা ভবনে এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ কতটা ছিল, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। প্রশাসন ইতিমধ্যেই ঘটনার কারণ এবং সম্ভাব্য গাফিলতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ডে আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, কী ভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া গোটা ভবনে ছড়িয়ে পড়ল এবং কেন এতজন আবাসিক বেরিয়ে আসতে পারলেন না—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রে। ফরেনসিক, ময়নাতদন্ত এবং সিসিটিভি-সহ অন্যান্য প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই এই মর্মান্তিক ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, তার পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে।



