দেশের বাজারে হু হু করে বাড়ছে চিনির দাম। উৎসবের মরশুমের আগে সরবরাহে চাপ এবং ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের ব্যবহার বাড়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার প্রায় ১০ বছর পর ফের চিনি আমদানির কথা ভাবছে ভারত। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাথমিক ভাবে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টন চিনি শুল্কমুক্ত ভাবে আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে কেন্দ্র।
চিনির বাজারে এই পরিস্থিতি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদক এবং এতদিন দেশের চাহিদা মিটিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি বিদেশে পাঠানো হত। কিন্তু এ বার ঘাটতির আশঙ্কা এতটাই বেড়েছে যে আমদানির পথ খতিয়ে দেখতে হচ্ছে সরকারকে। এর আগে প্রায় এক দশক আগে ভারতকে উল্লেখযোগ্য ভাবে চিনি আমদানি করতে দেখা গিয়েছিল।
চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যে কম বৃষ্টি ও আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা আগামী মরশুমের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইথানলের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আখ থেকে চিনির বদলে জ্বালানি তৈরিতে বেশি কাঁচামাল চলে যাচ্ছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছরে পেট্রোলে ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে কেন্দ্র জ্বালানি উৎপাদনে আখের ব্যবহারকে উৎসাহ দিয়েছে। ফলে চিনি কারখানাগুলির সামনে আখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চলতি পরিস্থিতিতে সরকার আগামী মরশুমে ইথানল তৈরির জন্য আখ ব্যবহারের পরিমাণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এ দিকে উৎসবের মরশুম সামনে থাকায় চিনির চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গণেশ চতুর্থী, দশেরা এবং দীপাবলির মতো উৎসবকে ঘিরে মিষ্টি ও খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে। ফলে এখনই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা না গেলে আগামী কয়েক মাসে দামের উপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
দেশের বাজারে ইতিমধ্যেই তার প্রভাব স্পষ্ট। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অগস্টে ভারতীয় চিনির দাম এক মাসের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলিতে তা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরের মতো বড় চিনি বাজারে দামও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।
তবে শুধু আমদানি করলেই যে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে, তা মনে করছেন না বাজারের সঙ্গে যুক্ত মহল। সরকারের লক্ষ্য মূলত উৎসবের মরশুমে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেই সঙ্গে চিনি মজুতের উপরও কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মাসে ১০ টনের বেশি চিনি ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের ১৫ দিনের বেশি মজুত না রাখার নির্দেশ কার্যকর হওয়ার কথা।
সরকারের হাতে আমদানির পাশাপাশি আরও কিছু বিকল্পও রয়েছে। বেসরকারি চিনি কারখানাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দেওয়া, আমদানি শুল্ক কমানো, মিলগুলির মাসিক বিক্রির কোটা পরিবর্তন এবং বন্দরভিত্তিক রিফাইনারিগুলির মজুত থেকে বাজারে চিনি ছাড়ার মতো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভারতের সম্ভাব্য আমদানির খবর আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চিনি সরবরাহকারী দেশ। এতদিন রপ্তানিকারক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া দেশটি যদি উল্টে বিদেশ থেকে চিনি কিনতে শুরু করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় চিনি রপ্তানি দীর্ঘ সময় ধরে চাপে থাকতে পারে বলে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
ফলে সামনে এখন দু’টি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ—দেশের বাজারে চিনির দাম কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং নতুন মরশুমে আখের উৎপাদন কেমন হয়। আমদানি, মজুত নিয়ন্ত্রণ এবং ইথানল নীতিতে পরিবর্তনের মতো একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু উৎসবের মরশুম যত এগিয়ে আসবে, চিনির বাজারে সেই চাপ আরও বাড়ে কি না, এখন সেদিকেই নজর।



