মাতৃত্বের সংজ্ঞা বদলাবে? চীনে আসছে রোবটিক গর্ভ প্রযুক্তি

চীনের বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন রোবটিক গর্ভ, যেখানে বেড়ে উঠবে ভ্রূণ। মাতৃত্বের ধারা বদলে যেতে পারে এই প্রযুক্তির হাত ধরেই, উঠছে নৈতিক বিতর্কও।

বিজ্ঞাপন
নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

চলতি সময়ের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে একের পর এক বিস্ময় হাজির হচ্ছে বিশ্ববাসীর সামনে। এবার মাতৃত্বকেই ছুঁয়ে গেল বিজ্ঞানের হাত। চীন তৈরি করছে রোবটিক গর্ভ বা প্রেগন্যান্সি রোবট। গবেষকরা দাবি করছেন, এই রোবটের কৃত্রিম গর্ভেই বেড়ে উঠতে পারবে মানব ভ্রূণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এবার কি সত্যিই বদলে যাবে মাতৃত্বের সংজ্ঞা?

চীনের গুয়াঝুর কাইওয়া টেকনোলজি নামের এক সংস্থা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজ্ঞানী ডা হ্যাং কুইপেংয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই রোবটিক গর্ভ প্রকল্প এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই বাজারে আসতে পারে এর প্রোটোটাইপ, যা মানব ভ্রূণকে জন্ম না দিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেবে কৃত্রিম উপায়ে।

গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, রোবটের শরীরের ভেতরে থাকবে একটি বিশেষ কৃত্রিম গর্ভ। সেখানেই ধাপে ধাপে বেড়ে উঠবে ভ্রূণ। মায়ের শরীরের মতোই তাকে টিউবের মাধ্যমে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় খাবার ও পুষ্টি উপাদান। ডা কুইপেংয়ে জানিয়েছেন, তারা এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করছেন যাতে মানব শিশুর পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে এই কৃত্রিম গর্ভের ভেতরে।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যেই বাজারে আসতে পারে প্রথম রোবটিক গর্ভ। এর সম্ভাব্য দাম ধরা হচ্ছে প্রায় ১৪,০০০ ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ লক্ষ টাকার সমান। যদি এটি সফলভাবে চালু হয়, তবে চিকিৎসা জগতে এটি হবে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

তবে এখানেই শেষ নয়, শুরু হয়েছে বিতর্ক। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই প্রযুক্তি নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেসব নারী সন্তান ধারণে শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এটি নতুন আশা জাগাবে। গর্ভধারণের নানা শারীরিক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা তুলছেন নৈতিক প্রশ্ন। গর্ভধারণ শুধুমাত্র ভ্রূণকে বড় করা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মা ও সন্তানের মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় সংযোগ। মায়ের শরীরের হরমোন পরিবর্তন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার আদানপ্রদান—এসবই গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমালোচকদের মতে, কোনও মেশিনের পক্ষে সেই সংযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়।

চীনের সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সমর্থকরা বলছেন, এটি প্রযুক্তির এক যুগান্তকারী সাফল্য, যা নতুন মাতৃত্বের পথ খুলে দিতে পারে। আর সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, শিশুর পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ধরনের সামাজিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।

আলোচনায় উঠে আসছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি শিশু জন্মগ্রহণ করে কৃত্রিম গর্ভে, তবে তার পরিচয় নির্ধারণ হবে কীভাবে? তার মা-কে বলা হবে রোবট, না কি ডিম্বাণু দাতা নারীকে? এর উত্তর এখনও খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা। ফলে এই প্রযুক্তি কার্যকর হলেও, সামাজিক ও নৈতিক জটিলতা কাটানো যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাকৃতিক ও আবেগময় প্রক্রিয়াটিকে যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া হলে সমাজে বড় পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কেউ কেউ এটিকে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ মনে করলেও, অন্যদের মতে এটি মানবিক সম্পর্কের গভীরে আঘাত হানবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রোবটিক গর্ভ নিয়ে বিশ্বে শুরু হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। প্রযুক্তির এই বিপ্লব কারও কাছে আশার আলো, কারও কাছে ভয়ঙ্কর আশঙ্কা। শেষ পর্যন্ত সত্যিই কি বদলে যাবে মাতৃত্বের সংজ্ঞা, নাকি থেমে যাবে নৈতিকতার বাঁধায়—সে উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর