লন্ডন থেকে দিল্লি— বিশ্বের দুই প্রান্তে একই ছবি, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। একদিকে ব্রিটেনে মে মাসের উষ্ণতার রেকর্ড ভেঙেছে, অন্যদিকে উত্তর ভারতে তাপমাত্রা ৪৬–৪৮ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছনোর আশঙ্কা। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি আর শুধু মৌসুমি ওঠানামা নয়— বিশ্বজুড়ে বদলে যাওয়া জলবায়ুর বড় সংকেত।
গত কয়েক সপ্তাহে ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বিশেষজ্ঞদের নজরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, এই গরম শুধু কয়েক দিনের ঘটনা নয়— এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়াগত ও জলবায়ুগত পরিবর্তন।


ইউরোপে কেন এত অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ?
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকা থেকে উঠে আসা উষ্ণ বায়ু পশ্চিম ইউরোপের উপর তৈরি হওয়া বিশাল উচ্চচাপ বলয়ের মধ্যে আটকে পড়েছে। এই উচ্চচাপ অঞ্চল কার্যত একটি ঢাকনার মতো কাজ করছে। ফলে ঠান্ডা বায়ু প্রবেশ করতে পারছে না এবং দিনের পর দিন তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে উঁচুতে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আবহাওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক দশকে ইউরোপে উষ্ণতার প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। উত্তর ইউরোপের বহু অঞ্চল এখন এমন গরমের মুখোমুখি হচ্ছে, যা আগে মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে দেখা যেত।
এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় সমস্যা হল পরিকাঠামোগত প্রস্তুতির অভাব। ইউরোপের বহু শহর দীর্ঘস্থায়ী গরমের জন্য তৈরি হয়নি। ফলে বাড়ি, অফিস, গণপরিবহণ থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা— সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। যে অঞ্চলে একসময় এয়ার কন্ডিশনারকে বিলাসিতা মনে করা হত, সেখানে এখন তা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।


ভারতে কেন বাড়ছে তাপের তীব্রতা?
ভারতীয় উপমহাদেশে পরিস্থিতি আরও জটিল। উত্তর ভারতে বর্তমানে চলছে ‘নৌতপা’— ঐতিহ্যগতভাবে বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়গুলির একটি। তবে এবার স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা আরও বেশি থাকায় উদ্বেগ বেড়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দেশের বিস্তীর্ণ অংশের উপর একটি স্থায়ী ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এর ফলে গরম বাতাস আটকে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাক-বর্ষার মেঘ গঠনেও বাধা তৈরি হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর প্রভাব। মৌসুমি বৃষ্টির গতি দুর্বল হওয়ায় তাপ কমার সুযোগ মিলছে না। পাশাপাশি এ বছর পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সক্রিয়তা কম থাকায় উত্তর ভারতে আর্দ্রতা ও ঠান্ডা বাতাসের সরবরাহও কমেছে। ফল— আরও শুষ্ক আবহাওয়া এবং দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি।
নতুন উদ্বেগ: ‘ওয়েট-বাল্ব’ পরিস্থিতি
শুধু তাপমাত্রা নয়, এখন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যৌথ প্রভাবও। মধ্য ও উপকূলীয় ভারতের বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ আর্দ্রতার সঙ্গে অতিরিক্ত গরম মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘ওয়েট-বাল্ব’ পরিস্থিতি।
এই অবস্থায় শরীরের ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হতে পারে না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক ঠান্ডা থাকার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে হিট স্ট্রোক বা গুরুতর শারীরিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপপ্রবাহকে শুধু ঋতুগত অস্বাভাবিকতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে— জলবায়ু পরিবর্তন এখন ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। আর তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মানুষের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থার উপর।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



