রথযাত্রার দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তের একটাই ইচ্ছা থাকে—একবার অন্তত ভগবান জগন্নাথের রথের দড়ি টানার সুযোগ পাওয়া। পুরীর রথযাত্রা হোক বা বাংলার মাহেশ, ইসকন কিংবা অন্য কোনও রথ উৎসব—রথের দড়ি ধরার জন্য ভক্তদের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু রথের দড়ি টানলে কী সত্যিই পুণ্য লাভ হয়? শাস্ত্রে এ বিষয়ে কী বলা আছে? এটি কি শুধুই লোকবিশ্বাস, নাকি এর পিছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য?
এই প্রতিবেদনে জানুন রথের দড়ি টানার মাহাত্ম্য, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং কেন ভক্তরা একে জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
রথের দড়ি টানার মাহাত্ম্য কী?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রার দিনে ভক্তিভরে রথের দড়ি টানা অত্যন্ত পুণ্যদায়ক।
বৈষ্ণব ধর্মমতে, এই সময় ভগবান জগন্নাথ নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে সকল ভক্তকে দর্শন দেন। তাই রথ টানা মানে কেবল একটি কাঠের রথ টানা নয়, বরং ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে সমর্পণ করা।
এই কারণেই বহু ভক্ত মনে করেন, জীবনে একবার রথের দড়ি টানার সুযোগ পাওয়া বিরল সৌভাগ্যের বিষয়।
শাস্ত্রে কী বলা আছে?
স্কন্দ পুরাণ, ব্রহ্ম পুরাণ এবং জগন্নাথ মহাত্ম্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে রথযাত্রার মাহাত্ম্যের উল্লেখ রয়েছে।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী—
- রথযাত্রার দর্শন শুভ।
- ভক্তিভরে ভগবানের নাম স্মরণ করে রথের সঙ্গে চলা পুণ্যদায়ক।
- রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করলে ঈশ্বরের কৃপা লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শাস্ত্রে এই পুণ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে ভক্তি, নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র দড়ি স্পর্শ করলেই অলৌকিক ফল মিলবে—এমন দাবি ধর্মগ্রন্থে স্পষ্টভাবে করা হয়নি।
কেন রথের দড়িকে এত পবিত্র মনে করা হয়?
রথের দড়ি ভগবানের রথের সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি ভক্তদের কাছে ঈশ্বরের সেবার প্রতীক।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই দড়ি টানার মাধ্যমে তাঁরা নিজের অহংকার, লোভ ও পাপবোধ ত্যাগ করে ভগবানের পথে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন।
অর্থাৎ, দড়ি টানার আধ্যাত্মিক অর্থ বাহ্যিক কাজের থেকেও অনেক গভীর।
রথ টানা কীসের প্রতীক?
আধ্যাত্মিক দর্শনে মানুষের জীবনকে একটি রথের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
- শরীর হল রথ।
- মন হল লাগাম।
- ইন্দ্রিয় হল ঘোড়া।
- আত্মা হল যাত্রী।
- আর ঈশ্বর হলেন প্রকৃত পথপ্রদর্শক।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রথ টানা মানে নিজের জীবনকে ধর্ম, সত্য এবং ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার অঙ্গীকার।
রথের দড়ি টানলে কী কী শুভ ফলের বিশ্বাস রয়েছে?
ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে—
- ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ হয়।
- জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর হওয়ার প্রার্থনা করা হয়।
- পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে বলে বিশ্বাস।
- মানসিক শান্তি ও আত্মিক তৃপ্তি লাভ হতে পারে।
- ভক্তির মাধ্যমে পুণ্য সঞ্চয় হয় বলে মনে করা হয়।
এসবই মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার অংশ; এগুলিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত দাবি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সবাই কি রথের দড়ি টানতে পারেন?
হ্যাঁ। রথযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সর্বজনীনতা।
জাতি, বর্ণ, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল ভক্ত রথের দড়ি টানতে পারেন। এই ঐতিহ্য ভগবানের কাছে সকল মানুষ সমান—এই ভাবনাকেই তুলে ধরে।
রথের দড়ি টানার সময় কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?
বিশেষ করে পুরী, মাহেশ বা বড় শহরের রথযাত্রায় বিপুল ভিড় হয়। তাই—
- প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন।
- ধাক্কাধাক্কি করবেন না।
- শিশু ও প্রবীণদের নিরাপত্তার দিকে নজর দিন।
- নির্ধারিত সময় ও নির্দিষ্ট স্থানে থেকেই অংশ নিন।
- কোনও গুজব বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন না।
ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রথ টানার চেয়ে ভক্তিই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতে, অবশ্যই।
যাঁরা ভিড় বা শারীরিক অসুবিধার কারণে রথের দড়ি টানতে পারেন না, তাঁরাও ভক্তিভরে জগন্নাথদেবের নামস্মরণ, পূজা, দান, জপ বা রথদর্শনের মাধ্যমে সমানভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে অংশ নিতে পারেন।
অর্থাৎ, পুণ্যের মূল ভিত্তি বাহ্যিক কাজ নয়, আন্তরিক ভক্তি।
রথের দড়ি টানা হিন্দু ধর্মের এক গভীর ভক্তিমূলক ঐতিহ্য। শাস্ত্র ও বৈষ্ণব দর্শনে এই কাজকে ঈশ্বরের সেবার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে প্রকৃত পুণ্য লাভের মূল শর্ত হল আন্তরিক ভক্তি, সৎকর্ম এবং বিনয়। তাই রথযাত্রার দিনে দড়ি টানার সুযোগ মিললে তা ভক্তিভরে গ্রহণ করুন, আর সুযোগ না পেলেও ঈশ্বরের স্মরণ ও সৎ জীবনযাপনের মধ্যেই রথযাত্রার প্রকৃত শিক্ষা খুঁজে নিন।




