নয়া দিল্লি: রাজীব কুমার মামলা ঘিরে ফের তীব্র আলোচনায় দেশের বিচার মহল। ছয় বছর আগে শুরু হওয়া মামলার কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় আজ সোমবার শুনানিতে বিস্ময় প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই (CJI B.R. Gavai) এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ সিবিআইকে প্রশ্ন করল, “এত বছর কেটে গেল, একবারও কি আপনারা শুনানির জন্য পদক্ষেপ করেছেন?”
২০১৯ সালে রাজ্য পুলিশের বর্তমান ডিজি রাজীব কুমারকে আগাম জামিন দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই সিবিআই Supreme Court-এর দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পরেও কেন মামলার অগ্রগতি হয়নি, তার উত্তর দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় সংস্থা।


সোমবারের শুনানিতে আদালতের বক্তব্য, “সিবিআইয়ের তরফে এমন শিথিলতা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোনও কারণ ছাড়াই মামলাটি বছরের পর বছর ঝুলে রাখা হয়েছে।”

রাজীব কুমার মামলার প্রেক্ষাপট
এই মামলা মূলত সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি (Saradha Chit Fund Scam)-এর সঙ্গে যুক্ত। ২০১৩ সালে রাজ্য সরকারের গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা SIT-এর সদস্য ছিলেন রাজীব কুমার। অভিযোগ, তিনি তদন্তের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন এবং সিবিআইকে সহযোগিতা করেননি।
সিবিআই পরে রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে এবং কলকাতা সিজিও কমপ্লেক্সে (CGO Complex) হাজিরা দিতে বলেন। রাজীব কুমার হাজিরা দিলেও, সিবিআই হেফাজতে নেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেয়। এর পরই আগাম জামিনের জন্য কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি।


২০১৯ সালের অক্টোবরে কলকাতা হাইকোর্ট রাজীব কুমারকে anticipatory bail মঞ্জুর করে। ঠিক তিনদিন পর সিবিআই সেই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়। নভেম্বরে হয় প্রথম শুনানি, এবং ডিসেম্বর মাসে আদালত নোটিস জারি করে। তারপর থেকে কেটে গিয়েছে ছয় দীর্ঘ বছর।
সুপ্রিম কোর্টের বিস্ময়
আজকের শুনানিতে CJI Gavai বলেন, “আমরা অবাক হয়েছি। ২০১৯ সালের মামলা, অথচ এত দিনে মাত্র দু’বার শুনানি হয়েছে। কোনও পক্ষ থেকেই তৎপরতা দেখা যায়নি।”
আদালতের মন্তব্যে স্পষ্ট, CBI vs Rajiv Kumar case-এ সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্নের মুখে। বিচারপতিরা বলেন, “কোনও ফৌজদারি মামলায় এমন ধীর গতির তদন্ত বা শুনানি বিচার ব্যবস্থার জন্য ভালো দৃষ্টান্ত নয়।”
রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মামলার গুরুত্ব
রাজীব কুমার এক সময় কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন। সারদা মামলার সময় তিনি শাসক দলের ঘনিষ্ঠ অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থা যখন তদন্ত শুরু করে, রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে ওঠে।
২০১৯ সালে সিবিআইয়ের দল রাজীব কুমারের বাড়িতে পৌঁছালে, পুলিশ কমিশনারকে বাঁচাতে রাজ্য প্রশাসন মুখোমুখি সংঘর্ষে নামে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ‘ধর্মতলায় ধর্না মঞ্চে’ বসেন। সেই সময় থেকেই এই মামলা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের এক বড় রাজনৈতিক অধ্যায় হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সিবিআইয়ের ওপর চাপ তৈরি করবে। আদালত যদি পুনরায় শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে, তবে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে এ বার case progress report জমা দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের একটি অংশ মনে করছে, এই মামলার পুনরুজ্জীবন রাজনৈতিকভাবে Trinamool Congress vs CBI সংঘাতকে ফের উস্কে দিতে পারে।
বিশ্লেষণ
আইনজীবীদের মতে, আদালতের এই মন্তব্য সিবিআইয়ের কাজের ধীরগতির ওপর সরাসরি আঘাত। দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার নিষ্ক্রিয়তা ভারতের বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে Rajiv Kumar case পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিল কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কের নাজুক বাস্তবতাকেও।
ছয় বছর পর পুরনো মামলায় সুপ্রিম কোর্টের এমন কড়া পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আগামী দিনে রাজীব কুমার মামলার গতিপথ কোন দিকে যায়, তার দিকে এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।







