শ্রাবণ ২২, অনন্তের পথে রবীন্দ্রনাথ

রাত বারোটার পরেই কবি অনন্তের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর পূবমুখী শিয়রের ওপাশের আকাশে তখন শান্ত,স্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

১৯৪১ – এর ৬ অগস্ট,২১ শ্রাবণ। অর্থাৎ কবির মহাপ্রয়াণের আগের দিন। শ্রাবণ পূর্ণিমার রাতে চারিদিকে চাঁদের আলোয় থই থই করছে। প্রতিমাদেবী বারান্দায় দাঁড়িয়ে টের পাচ্ছেন কোমল জোছনায় কার যেন কান্না লেগে আছে। উঠোনে জমে আছেব নিঝুম জমাট অন্ধকার। তবে, বাবামশায়ের ঘরে আলো জ্বলছে। লোকজন পা-টিপে টিপে খুব সন্তর্পনে যাতায়াত করছিল। যে কোনও সময় আসতে পারে সেই দুঃসংবাদটি- রবীন্দ্রনাথ চলে গিয়েছেন।
এই ভরা শ্রাবণেও আজ বৃষ্টি কোথায় যেন লুকিয়েছে। কিন্তু, তাতে কী? মানুষের চোখের জলেই আজ ভিজে যাবে মাটি। একা অঝোরে কাঁদছিলেন প্রতিমাদেবী। একসময় সুধাকান্ত ও রাণী চন্দ এসে তাঁকে বললেন, “চলুন একবার।” রবীন্দ্রনাথের ঘরের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়ালেন প্রতিমা। বাবামশায়ের কানের কাছে গিয়ে ডাকলেন একবার, “বাবামশাই, আমি………” আর বলতে পারলেন না। বাবামশাই কোনও উত্তর দিলেন না।

শ্রাবণ ২২, অনন্তের পথে রবীন্দ্রনাথ
শ্রাবণ ২২, অনন্তের পথে রবীন্দ্রনাথ

বাবামশায়ের পাশে নিকট আত্মীয়রা ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছেন। রাত বারোটার পরেই কবি অনন্তের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর পূবমুখী শিয়রের ওপাশের আকাশে তখন শান্ত,স্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ। ভরা জোছনার চন্দন ঝরে পড়ছে বিশ্বকবির অনন্তলোকগামী দুটি ডানায়, ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছেন কবি। বাতাসে ভেসে আসছে…”কে যায় অমৃতধাম যাত্রী…” রাত দুটোর সময় রাণী মহলানবিশ ফোন পেলেন।

৭ আগস্ট, ১৯৪১। বাংলার ২২ শ্রাবণ, ভোর চারটে থেকে নিকট আত্মীয়,বন্ধু-পরিজন,প্রিয়জন দলে দলে আসতে শুরু করেছেন। ঠাকুর বাড়ির বাইরে সকাল থেকে কবির অগণিত ভক্তের ভিড়,তারা সব্বাই একটিবারের জন্যে তাঁকে শেষবারের জন্যে দেখতে চান। কী প্রবল সেই প্রবল জনস্রোত! একটু পরেই বোধহয় ঠাকুর বাড়ির মূল প্রবেশ দ্বার ভেঙে পড়বে। সকাল সাতটায় কবির শেষশয্যার পাশে বসে উপাসনা শুরু হলো। মেয়েরা গাইছে কবির লেখা ব্রহ্মসংগীত।

শ্রাবণ ২২, অনন্তের পথে রবীন্দ্রনাথ
শ্রাবণ ২২, অনন্তের পথে রবীন্দ্রনাথ

গুরুদেবের পায়ে প্রতিমাদেবী অঞ্জলি ভরে চাঁপাফুল দিয়ে গেলেন। গুরুদেবের পায়ে হাত রেখে রাণীরা টের পেলেন শরীরের ক্রমশ উষ্ণতা কমে আসছে। দুপুর বারোটা দশ মিনিটে কবি সম্পূর্ণ অনন্তলোকের পথে যাত্রা শুরু করলেন। নন্দলাল বসু গুরুদেবের শেষযাত্রার পালঙ্ক নির্মাণ করেছেন। সহযোগীকে আবেগাপ্লুত ধরা গলায় তিনি বললেন, “যা, আজ রাজার-রাজা নগর পরিক্রমা করে চিরবিদায় নেবেন, বেনারসি চাদর নিয়ে আয়।” লাল বেনারসি কাপড়ে সোনালী বুটি দেওয়া চাদর পাতা হল পালঙ্কে। সহস্র জুঁই,বেলের মালায় ঢাকা পড়ল সেই রাজ পালঙ্কটি ।

গুরুদেবকে সাদা বেনারসি জোড় পরানো হলো, সঙ্গে গরদের পাঞ্জাবি, কোঁচানো ধুতি। গলায় রজনীগন্ধার গোড়ের মালা, কপালে চন্দন। তাঁর চারপাশে শতসহস্র শ্বেতপদ্ম ও রজনীগন্ধা। হাতদুটি রাখা বুকের কাছে। সেখানে দেওয়া হলো একটি শ্বেতপদ্ম কোরক। ঠিক যেন ঈশ্বরের মতো শুয়ে রয়েছেন নিদ্রামগ্ন কবি। একসময় শত সহস্র মানুষের কাঁধে চেপে শুরু হল অনন্তলোকে অন্তিম যাত্রা…….. শ্রাবণের শরীরে তখম হাত রাখছিল চির বিষাদ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবসে জানাই শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

লেখিকাঃ আরাত্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (শিক্ষিকা)

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন