মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) থেকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)—দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বারবার তোলাবাজি বন্ধের কড়া বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু তার মধ্যেই পূর্ব বর্ধমান ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে বাসকর্মীদের কাছ থেকে প্রতিদিন টাকা আদায়ের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে অস্বস্তিতে বঙ্গ বিজেপি। বাস মালিক সংগঠনের দাবি, বিজেপির বিভিন্ন সংগঠনের নাম করে প্রতি বাস থেকে প্রায় ৩০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ বন্ধ না হলে বাস পরিষেবা বন্ধের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব বর্ধমানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড ও রুটে এই টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বর্ধমান জেলা বাস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জানকী রঞ্জন সিনহা বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর দাবি, শুধু পূর্ব বর্ধমান নয়, পাশের কয়েকটি জেলার বাসস্ট্যান্ডেও একই কায়দায় টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে।
বাস মালিক সংগঠনের অভিযোগ, আলিশা, নবাবহাট, মঙ্গলকোট, গুসকরা, কালনা, কাটোয়া-সহ একাধিক রুটে চলাচলকারী বেসরকারি বাসের কর্মীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সংগঠনের নাম করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও বিএমএসের নাম, কোথাও পথ কর্মচারী সংস্থার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
জানকী রঞ্জন সিনহার অভিযোগ, প্রতিটি বাস থেকে নিয়ম করে প্রায় ৩০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় সব রুট মিলিয়ে প্রায় ১২০০টি বেসরকারি বাস প্রতিদিন পরিষেবা দেয়। ফলে প্রতিটি বাস থেকে টাকা নেওয়া হলে দৈনিক আদায়ের অঙ্কও যথেষ্ট বড় হয়ে দাঁড়ায়।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বাস মালিক সংগঠন। তবে দলের তরফে তাঁদের জানানো হয়েছে, বিজেপির কেউ এই টাকা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতেও বলা হয়েছে। সেইমতো পুলিশ-প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন বাস মালিকরা।
বাস মালিক সংগঠনের দাবি, রাজ্যের মন্ত্রী ও বিধায়কদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে। ছুটির কারণে বুধবার জেলাশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। তবে প্রশাসনের কাছে বিষয়টি দ্রুত তোলা হবে বলেই জানানো হয়েছে।
অভিযোগের পর এবার সরাসরি ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাস মালিক সংগঠন। জানকী রঞ্জন সিনহার স্পষ্ট বক্তব্য, এই টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে পূর্ব বর্ধমান জেলায় বাস চালানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন তাঁরা। ফলে অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে জেলার গণপরিবহণ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
ঘটনায় রাজনৈতিক অস্বস্তি বাড়তেই পাল্টা কড়া বার্তা দিয়েছেন বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক তথা রাজ্যের শিল্প প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। তাঁর বক্তব্য, দলের নাম ব্যবহার করে কোথাও তোলাবাজি বরদাস্ত করা হবে না। যারা এই ধরনের কাজ করছেন, তাঁদের সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পুলিশ কাউকেই রেয়াত করবে না বলেও বার্তা দিয়েছেন মন্ত্রী।
বিষয়টি এখন পুলিশের নজরেও এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে জেলার আঞ্চলিক পরিবহণ দপ্তর এবং জেলাশাসকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানা গিয়েছে। ফলে বাস মালিক সংগঠনের তোলা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই এখন নজর।
বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বের কাছে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অস্বস্তির। কারণ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার তোলাবাজি, কাটমানি ও দাদাগিরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে। সেই আবহে দলের বিভিন্ন সংগঠনের নাম করে বাসকর্মীদের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগ উঠলে তা রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে।
এখন মূল প্রশ্ন, এই অভিযোগের পিছনে কারা রয়েছে এবং সত্যিই কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় করা হচ্ছে কি না। পুলিশি তদন্তে তার উত্তর মিলতে পারে। তবে অভিযোগ দ্রুত খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা না নিলে শুধু বাস মালিকদের সঙ্গে বিরোধ নয়, জেলার সাধারণ যাত্রী পরিষেবাতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকছে।




