তোলাবাজির অভিযোগে বিধায়কদের কড়া বার্তা শমীকের, ‘২০-৩০ জন গেলেও সরকার পড়বে না’

বাংলায় বিজেপি সরকারের ১০০ দিন পূর্তির আগে দলীয় বিধায়কদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি ও কাটমানির অভিযোগ নিয়ে কড়া অবস্থান শমীক ভট্টাচার্যের, প্রয়োজনে ২০-৩০ জনকেও সরানোর বার্তা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বাংলায় বিজেপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার মুখে দলের অন্দরে কড়া বার্তা দিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। দলের একাংশের বিধায়কের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, কাটমানি এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে রবিবার কার্যত ‘শেষ সতর্কবার্তা’ দিলেন তিনি। নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির রুদ্ধদ্বার প্রশিক্ষণ শিবিরে শমীকের বার্তা, প্রয়োজনে ২০-৩০ জন বিধায়ককেও দল থেকে সরিয়ে দিতে পিছপা হবে না নেতৃত্ব। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে শমীক ভট্টাচার্য ২০২৫ সালের জুলাই থেকে রয়েছেন। এ দিন তাঁর বক্তব্যে দলের অন্দরে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সূত্রের দাবি। আগামী বুধবার বাংলায় বিজেপি সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হচ্ছে। সেই উপলক্ষে সরকারের কাজের খতিয়ান নিয়ে প্রচারে নামার প্রস্তুতির মধ্যেই দলীয় বিধায়কদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এমন কড়া অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

রবিবারের ওই প্রশিক্ষণ শিবিরে শমীক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুনীল বনসল এবং শিবপ্রকাশ। বিভিন্ন জেলার সভাপতি, বিধায়ক, মন্ত্রী এবং রাজ্য পদাধিকারীদেরও সেখানে দেখা যায়। মূলত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কাজ কী ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে, তার প্রচার কৌশল নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে সেই বৈঠকেই দলীয় বিধায়কদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সরব হন শমীক।

দলীয় সূত্রের দাবি, শমীক বৈঠকে স্পষ্ট করে দেন, একাধিক বিধায়কের বিরুদ্ধে তোলাবাজি এবং কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ পৌঁছেছে নেতৃত্বের কাছে। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, অভিযোগের সত্যতা সামনে এলে কোনও পদমর্যাদাই অভিযুক্তদের রক্ষা করবে না।

শমীক নাকি আরও বলেন, বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ২০৮। তার মধ্যে ২০-৩০ জনকে দল থেকে বাদ দিলেও সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনও প্রভাব পড়বে না। এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-এর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে বলেও তিনি বৈঠকে জানিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত বিধায়কদের দ্রুত নিজেদের আচরণ সংশোধনের বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

শুধু তোলাবাজির অভিযোগ নয়, ভোটে জেতার পর বিধায়কদের ভূমিকা নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। তাঁর বক্তব্য, বিধায়করা একা নিজেদের ক্ষমতায় নির্বাচনে জেতেননি। দলের সংগঠন, কর্মী এবং নেতৃত্বের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই তাঁরা বিধানসভায় পৌঁছেছেন। তাই এমন কোনও কাজ করা উচিত নয়, যাতে বিজেপির ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বৈঠকে শমীকের বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটে জয় না পেলেও কয়েকজন নেতা এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন এবং তোলাবাজির অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধে উঠছে। দলের কাছে এসব বিষয়ে তথ্য রয়েছে বলেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে আগামী দিনে শুধু বিধায়ক নন, দলের সঙ্গে যুক্ত অন্য নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজেপির অন্দরের খবর, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক মাসে দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তোলাবাজি, অনিয়ম এবং দলীয় নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে বহু নেতা-কর্মীকে শোকজ করার পাশাপাশি কয়েকজনকে সাসপেন্ডও করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। তবে অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে কোথায় তদন্ত শেষ হয়েছে এবং কোথায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হয়েছে, তা পৃথকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি।

এরই মধ্যে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা কয়েকজন নেতা-কর্মীকে নিয়ে দলের নিচুতলায় প্রশ্ন উঠছে বলেও দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ ছিল, তাঁদের কাউকে বিজেপির মঞ্চে দেখা যাওয়া নিয়ে দলের একাংশ আপত্তি তুলেছে। শমীকের বক্তব্যে সেই বিষয়টিরও ইঙ্গিত রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। বিজেপি নেতৃত্ব যে ‘তৃণমূলীকরণ’-এর অভিযোগ নিয়ে সতর্ক, তা এর আগেও দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, শমীকের বক্তব্যকে কটাক্ষ করেছেন তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)। তাঁর দাবি, বিজেপি রাজ্য সভাপতি নিজের দলের ২০-২৫ জনকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে অন্য দল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের বিজেপিতে জায়গা দেওয়া হচ্ছে। ফলে শমীকের বক্তব্য এবং বিজেপির বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই বলেই তাঁর দাবি।

তবে রাজনৈতিক চাপানউতোরের বাইরে রবিবারের বৈঠক থেকে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব যে বার্তা দিতে চেয়েছে, তা স্পষ্ট—দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এমন অভিযোগকে আর হালকা ভাবে দেখা হবে না। বিশেষ করে তোলাবাজি ও কাটমানির অভিযোগে অভিযুক্ত হলে দলীয় পদ বা বিধায়ক পরিচয় কোনও ‘রক্ষাকবচ’ হবে না—১০০ দিন পূর্তির আগে শমীক ভট্টাচার্যের কড়া বক্তব্যে অন্তত সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আগামী দিনে কতটা কঠোর পদক্ষেপ হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন