টলিউডে দীর্ঘদিন ধরেই নিজের স্পষ্ট মতামতের জন্য পরিচিত পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় আবারও খোলাখুলি বললেন রাজনীতি ও চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে তাঁর অবস্থান। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি যেমন বিস্মিত, তেমনই নতুন সরকারের কাছে কিছু বাস্তব প্রত্যাশাও রেখেছেন।
একসময় নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দলের পাশে দাঁড়ানো এই অভিনেতা এখন বলছেন—দল নয়, কাজই শেষ কথা। তাঁর বক্তব্য, যদি নতুন সরকারের অধীনে চলচ্চিত্র শিল্প রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় এবং উন্নয়নের পথ খুলে যায়, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।


রাজনৈতিক পালাবদল ও পরমব্রতের দৃষ্টিভঙ্গি
পরমব্রত মনে করেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর কোনও সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই জনরোষ তৈরি হয়। তিনি স্পষ্ট বলেন, তৃণমূল সরকারের একাধিক ভালো প্রকল্প থাকলেও কিছু নেতার আচরণ, দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সেই ইতিবাচক কাজকে ঢেকে দিয়েছে।
তাঁর কথায়, “মানুষের মধ্যে একটা রাগ জমেছিল, সেটা অস্বাভাবিক নয়।” তবে এত বড় ব্যবধানে ফল হবে, তা তিনি নিজেও অনুমান করতে পারেননি।
তৃণমূলের হয়ে প্রচার, তবুও মতাদর্শে ভিন্নতা
নিজেকে বিজেপির মতাদর্শের বিরোধী বলেই দাবি করেছেন পরমব্রত। বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি সরব ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যায় না।


তবুও কেন তৃণমূলের হয়ে প্রচারে নামলেন? তাঁর যুক্তি—সেই সময় প্রতিবাদের কোনও শক্তিশালী বিকল্প ছিল না। বাম বা কংগ্রেসের উপস্থিতি কার্যত অনুপস্থিত থাকায় তিনি তৃণমূলকেই সেই প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেছিলেন।
বিজেপি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
যদিও মতাদর্শগতভাবে বিরোধী, তবুও বিজেপির কিছু দিককে ইতিবাচকভাবে দেখছেন পরমব্রত। তাঁর মতে, ব্যবসা, শিল্প ও উন্নয়নের প্রতি জোর—এই বিষয়গুলো যদি পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হবেন।
অর্থাৎ, তাঁর অবস্থান স্পষ্ট—রাজনৈতিক রং নয়, উন্নয়নই মুখ্য।
টলিউড ও ‘ফেডারেশন’ বিতর্ক
চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে তাঁর বক্তব্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। পরমব্রতের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে টলিউড এমন কিছু মানুষের হাতে চলে যায়, যাঁদের সিনেমার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে এবং শিল্পের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়।
তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তিনি নিজে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই লড়াই রাজনৈতিক রং পায় এবং তাঁর কাজকর্মও বাধার মুখে পড়ে। এমনকি একসময় তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চাইতে হয়েছিল—যা তাঁর ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে বলেও স্বীকার করেন।
‘ব্যান কালচার’ ও ‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে সতর্কবার্তা
নতুন সরকারের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—চলচ্চিত্র শিল্পকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। তিনি সরাসরি বলেন,
“এই ফল যদি ফেডারেশনকে রাজনৈতিক খবরদারি থেকে মুক্ত করে, তাহলে সেটা সবার জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।”
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন তথাকথিত ‘ব্যান কালচার’ এবং ‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে। তাঁর আশা, নতুন সরকার এই সংস্কৃতি বন্ধ করবে এবং শিল্পীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করবে।
শিল্পের সিদ্ধান্তে শিল্পীদেরই ভূমিকা
পরমব্রতের মতে, চলচ্চিত্র শিল্পের নীতি নির্ধারণে এমন মানুষদের থাকা উচিত, যাঁরা বাস্তবে এই শিল্পে কাজ করেছেন এবং এর ভিতরকার কাঠামো বোঝেন। বাইরের লোকদের হাতে ক্ষমতা গেলে শিল্পের ক্ষতি হয়—এই বার্তাই তিনি স্পষ্টভাবে দিয়েছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে মন্তব্য
রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অটুট। তিনি বলেন, “উনি লড়াকু মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। ভবিষ্যতেও নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবেন।”
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট—তিনি কোনও দলের অন্ধ সমর্থক নন। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন। রাজনৈতিক পালাবদলের এই মুহূর্তে তাঁর আশা, নতুন সরকার টলিউডকে মুক্ত, পেশাদার এবং উন্নয়নমুখী পরিবেশ দেবে।
সিনেমা শিল্প যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে এগোতে পারে, তবে সেটাই হবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—এমনটাই বিশ্বাস পরমব্রতের।







