দুই সীমান্তে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। একদিকে আফগানিস্তানের তালিবান বাহিনী, অন্যদিকে ভারতের সম্ভাব্য ‘আক্রমণ’— এই দুই পড়শির মোকাবিলায় নাকি দ্বিমুখী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান। এমনই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। তাঁর মতে, শুধু তালিবান নয়, সীমান্তে ভারতের দিক থেকেও সংঘাত শুরু হতে পারে, আর সেই সম্ভাবনাকেই এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ইসলামাবাদ।
সাম্প্রতিক এক পাক টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসিফকে প্রশ্ন করা হয়— ভারত সীমান্তেও কি সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে? প্রশ্নটি কার্যত লুফে নিয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন, “অবশ্যই, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং, সেটা খুবই বাস্তব।” এর পরেই তাঁর মন্তব্য, সীমান্তে ‘নোংরা খেলা’ খেলতে পারে ভারত। আফগানিস্তান ও ভারতের দুই ফ্রন্টেই যুদ্ধের পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তান সেনা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আফগানিস্তান সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
গত কয়েক দিন ধরে পাক–আফগান সীমান্তে সংঘর্ষ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ৯ অক্টোবর আফগান রাজধানী কাবুলে বোমাবর্ষণের অভিযোগ ওঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এর জবাবেই তালিবান সীমান্তে হামলা চালায়। রাতভর সংঘর্ষ চলে দুই পক্ষের মধ্যে। পাক যুদ্ধবিমান হামলা চালায় কন্দহরে, যাতে অন্তত ৫০ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে তালিবান সূত্রের দাবি।
সংঘর্ষ কিছুটা থামাতে বুধবার দু’দেশ ৪৮ ঘণ্টার জন্য সাময়িক সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, এই সংঘর্ষবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও সন্দেহ আছে। কারণ, তাঁর অভিযোগ— সংঘর্ষবিরতির সিদ্ধান্ত আসলে “দিল্লি থেকে নেওয়া হচ্ছে”। অর্থাৎ, আফগানিস্তানের পেছনে ভারতের ‘মদত’ রয়েছে বলে ইঙ্গিত আসিফের।
ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ পাকিস্তানের
বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক বৈঠকে আসিফ আরও বলেন, “আফগান বাহিনী আসলে ভারতের মদতেই যুদ্ধ চালাচ্ছে। আমরা আশঙ্কা করছি, ভারত সীমান্তেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।” তাঁর এই বক্তব্য ইসলামাবাদের কৌশলগত অস্থিরতার দিকটিকেই প্রকাশ করছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল।
ভারত অবশ্য এই অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করেছে। বৃহস্পতিবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। পাকিস্তান বরাবরই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে আশ্রয় ও মদত দেয়। প্রতিবেশীদের দিকে আঙুল তোলা তাদের পুরনো অভ্যাস।”
তিনি আরও বলেন, “আফগানিস্তান নিজের মাটিতে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। তাতে পাকিস্তান ক্ষুব্ধ। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করে।”
আফগানিস্তানের পাশে দাঁড়াচ্ছে ভারত
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দিক থেকেও ভারত এখন আফগানিস্তানের পাশে অবস্থান নিচ্ছে। সম্প্রতি তালিবান সরকারের মন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি দিল্লি সফরে আসেন। সেই সফরের মাঝেই পাক-আফগান সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারতের আশ্রয়ে থাকা ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) গোষ্ঠীই তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে। তবে দিল্লি শুরু থেকেই এই দাবি অস্বীকার করে আসছে।
দ্বিমুখী যুদ্ধের আশঙ্কা: বিশ্লেষকদের চোখে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের এই বক্তব্য আসলে দ্বিমুখী চাপের কূটনৈতিক ইঙ্গিত। একদিকে আফগান সীমান্তে তালিবান সংঘাত, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সীমান্ত উত্তেজনা— দুই ফ্রন্ট সামলানো পাকিস্তানের পক্ষে বাস্তবে কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসলামাবাদের অবস্থান ক্রমশ নাজুক হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, তালিবান ও ভারত— এই দুই ফ্রন্টে একইসঙ্গে লড়াইয়ের দাবি পাকিস্তানের “অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা” হিসেবেও দেখা যেতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই ইসলামাবাদ আবার সীমান্ত ইস্যুকে সামনে এনে জনগণকে একত্র করার চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত, দৃষ্টি আন্তর্জাতিক মহলের
বর্তমানে আফগানিস্তান সীমান্তে সংঘাতবিরতি চললেও পরিস্থিতি অস্থির। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও টানটান। এই অবস্থায় দ্বিমুখী সংঘর্ষের আশঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
তালিবান, ভারত ও পাকিস্তান— এই ত্রিমুখী উত্তেজনা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং জাতিসংঘও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে খবর।



