নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (NRS)-এর নার্স রুপালি বর্মনের (Rupali Barman) রহস্যমৃত্যুর তদন্তে নতুন করে সামনে এল তাঁর স্বামীর বক্তব্য। রাহুল দাস জানিয়েছেন, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ স্ত্রীর সঙ্গে শেষ বার ফোনে কথা হয়েছিল তাঁর। তখন রুপালির কথাবার্তায় কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল না বলেই দাবি স্বামীর। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতালের শৌচাগার থেকে উদ্ধার হয় ৩০ বছরের নার্সের অচেতন দেহ।
রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, শেষ ফোনালাপ খুব বেশি ক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রুপালি তখন মেট্রোয় ছিলেন। পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দিয়েছিলেন তিনি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল বলেও স্বামীকে জানিয়েছিলেন রুপালি। সেই স্বাভাবিক কথোপকথনের পর হাসপাতালে পৌঁছে কী ঘটেছিল, তা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না রাহুল।
পরিবারের তরফে এখনও থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। রাহুল জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই অভিযোগ করবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রথমে তিনি জানতে চান, ঠিক কী ভাবে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
রুপালির স্বামী একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন এবং বাড়ি থেকেই অনলাইনে কাজ করেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর আবেদনেই NRS-এ ময়নাতদন্ত না করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি।
রুপালি ও রাহুলের প্রায় তিন বছর আগে আইনি বিয়ে হয়েছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে সামাজিক ভাবে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন রাহুল।
এদিকে পুলিশও আপাতত ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে। এখনও কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়নি। ফলে রুপালির মৃত্যু আত্মহত্যা কি না, সেই বিষয়ে তদন্তকারীরা এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছেন না। একই সঙ্গে অন্য কোনও সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বুধবার রাতে NRS-এর স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে ডিউটিতে ছিলেন রুপালি। রাত ৮টা নাগাদ শিফট বদলের পর তিনি নার্সিং স্টেশনে কাজে যোগ দেন এবং ভর্তি রোগীদের পরিষেবা দেন। পরে রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ শৌচাগারে যান বলে জানা গিয়েছে।
দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও রুপালি নার্সিং স্টেশনে ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা শৌচাগারের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করেন। কোনও সাড়া না পেয়ে পরে দরজা ভাঙা হয়। ভিতরে অচেতন অবস্থায় রুপালিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর পাশে মোবাইল ফোনও ছিল বলে জানা গিয়েছে। দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে ফেন্টানিলের প্রসঙ্গও। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, শৌচাগারে যাওয়ার আগে রুপালি ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফেন্টানিল শক্তিশালী opioid painkiller, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যানাস্থেশিয়ায় ব্যবহৃত হয়। তবে ওই ওষুধের কারণেই রুপালির মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করলেও, ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই আপাতত কোনও সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত বলে মানছে না পুলিশ।
পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতরও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রুপালির শেষ ফোনালাপ, হাসপাতালের ভিতরে তাঁর গতিবিধি, সহকর্মীদের বক্তব্য, ওষুধের ভায়াল এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে তদন্তের গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথন থেকে রাতের ডিউটির মধ্যে কী ঘটেছিল—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রুপালির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক রিপোর্টে কতটা স্পষ্ট হয়, সেদিকেই তাকিয়ে পরিবার ও তদন্তকারী সংস্থা।



