বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করা হয়েছে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে (Subhas Chandra Bose) নিয়ে তাঁর মন্তব্যের জেরে আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাতেও নিজের অবস্থান থেকে সরছেন না বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ (Anant Maharaj)। তাঁর দাবি, তিনি নেতাজিকে অপমান করেননি, কাউকে গালাগালও করেননি। ইতিহাসে যা রয়েছে, সাধারণ মানুষের সামনে তিনি শুধু সেই তথ্যই তুলে ধরেছেন বলে সাফাই দিয়েছেন তিনি।
অনন্ত মহারাজের বক্তব্য, যে সময়ের ঘটনা নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, তখন তাঁর জন্মই হয়নি। ফলে কোনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে তিনি কিছু বলেননি বলেই তাঁর দাবি। তাঁর কথায়, তিনি কোনও মিথ্যা বা মনগড়া কাহিনি তৈরি করেননি এবং কারও বদনামও করেননি। তাঁর মন্তব্য নিয়ে আইনি ভাবে অন্যায় প্রমাণিত হলে শাস্তি মেনে নিতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
তবে অনন্ত মহারাজের এই অবস্থানেই বিতর্ক থামছে না। নেতাজিকে নিয়ে তাঁর মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একাধিক জায়গায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যেই রাজ্য সরকারের তরফে তাঁর বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকা এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অনন্ত মহারাজ নেতাজির ভূমিকা সম্পর্কে একাধিক বিতর্কিত দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi), জওহরলাল নেহরু (Jawaharlal Nehru), কংগ্রেস এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army)-এর ইতিহাস।
অনন্ত মহারাজ দাবি করেন, শুধু গান্ধী, নেহরু বা কংগ্রেসের আন্দোলনের কারণেই ভারত স্বাধীন হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাঁর বক্তব্যে কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকা ইতিহাসে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
তিনি আরও দাবি করেন, কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাজিত করেছিলেন। জার্মানির হাতে বন্দি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাদের নেতাজির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁদের নিয়েই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নেতাজি সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছিলেন বলেও দাবি করেন অনন্ত মহারাজ।
এখানেই শেষ নয়। কোচবিহারের মহারাজাকে স্বাধীন ভারতের সম্রাট করা হলে দেশভাগ হত না এবং ভারত ও পাকিস্তান একসঙ্গে থাকত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয় প্রবল বিতর্ক।
বিতর্কের আবহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) নেতাজিকে নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্যের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন। তিনি জানান, নেতাজিকে নিয়ে অপমানজনক বা মিথ্যা প্রচার করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও নাম না করেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
এর পরেই অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। তার মধ্যেই বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তাঁর উপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। রাজ্য তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে বৃহস্পতিবার এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
তবে সম্মান প্রত্যাহারের পরও অনন্ত মহারাজের বক্তব্যে অনুশোচনার কোনও ইঙ্গিত নেই। বরং তাঁর দাবি, তিনি ইতিহাসের কিছু তথ্যই সামনে এনেছেন। নিজের বক্তব্যের জন্য আইনি শাস্তি হলে তা মেনে নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে একদিকে অনন্ত মহারাজ নিজের বক্তব্যে অনড়, অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তাঁর মন্তব্যের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এখন আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আলোচনায়। ফলে আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



