২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী—কেন নির্বাচনে ‘নন প্লেয়ার’ নীতীশ কুমার?

টানা দশমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন নীতীশ কুমার। কিন্তু দুই দশক ধরে তিনি নিজে বিধানসভা ভোটে দাঁড়ান না। কী সেই কৌশল? কেন এই সিদ্ধান্ত?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী—কেন নির্বাচনে ‘নন প্লেয়ার’ নীতীশ কুমার? বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোটের চোখধাঁধানো জয়ের পর টানা দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন নীতীশ কুমার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তিনি নিজে এবারও ভোটে দাঁড়াননি। শুধু এবার নয়, প্রায় ২০ বছর ধরে কোনও বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেন না নীতীশ। অথচ মসনদ থাকে তাঁর হাতেই।

এই বিশেষ রাজনৈতিক কৌশলকে অনেকেই বলছেন—নীতীশের ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’ মডেল। ভোটে না লড়েও কীভাবে টানা ক্ষমতায়? কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি? সেই প্রশ্নই এখন বিহারের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত।

২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী—কেন নির্বাচনে ‘নন প্লেয়ার’ নীতীশ কুমার?

১৯৮৫–১৯৯৫: বিধানসভা থেকে লোকসভা—তারপর দীর্ঘ বিরতি:
নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক জীবনের শুরু বিহার বিধানসভা থেকেই। ১৯৮৫ সালে হারনৌত কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হন তিনি। ১৯৯৫ সালে সেই কেন্দ্র থেকেই ফের লড়ে পরাজিত হন। তারপর থেকেই তিনি বিধানসভা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরোপুরি ছাড়েন

২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী—কেন নির্বাচনে ‘নন প্লেয়ার’ নীতীশ কুমার?
২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী—কেন নির্বাচনে ‘নন প্লেয়ার’ নীতীশ কুমার?

তবে লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে দেখা গেছে নিয়মিত।
১৯৮৯, ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪—ছ’বার তিনি লোকসভা ভোটে লড়েছেন। ২০০৪ সালে বাঢ় ও নালন্দায় লড়লেও বাঢ় থেকে হারেন। সেই বছরই তিনি শেষবার ভোটের মাঠে নেমেছিলেন।এর পর ২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে, মাত্র নয় মাস বাদ দিলে, টানা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী

তাহলে কেন নিজেরাই ভোটে নামেন না নীতীশ? নিজের ‘নন প্লেয়ার’ অবস্থানের ব্যাখ্যা নীতীশ নিজেই দিয়েছেন একাধিকবার।
২০১২ সালের জানুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন—
“আমি নিজের ইচ্ছেতেই বিধান পরিষদের সদস্য হয়েছি। কোনও বাধ্যবাধকতা নয়। বিধান পরিষদ অত্যন্ত সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান।”

২০১৫ সালে বিহার ভোটের সময় তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন—
“আমি যদি নিজে প্রার্থী হই, তাহলে ফোকাস শুধু আমার আসনেই আটকে যাবে। দল ও জোটের নেতা হিসেবে তা ঠিক নয়।” অর্থাৎ নিজের নির্বাচনী লড়াইয়ের চাপ এড়িয়ে, গোটা রাজ্যের প্রচার ও নির্বাচনী কৌশলে তিনি ১০০% মন দিতে চান—এটাই তাঁর যুক্তি।

বিধান পরিষদ: নীতীশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বলয়
বিহার সেই কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে একটি, যেখানে বিধান পরিষদ (Legislative Council) রয়েছে। এটি বিধানসভার উচ্চকক্ষ। দলগুলি বিধানসভা নির্বাচনে যে পরিমাণ আসন জেতে, তার ভিত্তিতে পরিষদের সদস্য বাছাই হয়।

কেউ বিধান পরিষদের সদস্য হলেই তিনি মন্ত্রী হতে পারেন। নীতীশও সেই পথেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন টানা দুই দশক। এই পথ তাঁকে—

• নির্বাচনী ঝুঁকি থেকে মুক্তি দেয়
• বিরোধী ঢেউতেও নিরাপদ রাখে
• রাজ্যজোড়া প্রচারে সময় দেয়
• সরকারে স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করে

এটাই নীতীশের রাজনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি। আর তাই ২০ বছর ভোটে না লড়েও দশমবার মুখ্যমন্ত্রী তিনিই!

কৌশল কতটা সফল? ফলাফল বলছে—অত্যন্ত সফল:
নীতীশ গত ২০ বছরে নানা জোট বদল করেছেন—এনডিএ, মহাগঠবন্ধন, আবার এনডিএ—তবু মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ফিরেছেন। এই ধারাবাহিকতা তাঁর রাজনৈতিক ‘সার্ভাইভাল স্কিল’-এর একটি অনন্য উদাহরণ।

এবারেও জোটের মুখ ছিলেন তিনি, প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি—
শুধু ভোটে দাঁড়াননি। ফলাফল আবার তাঁর হাতেই।

এনডিএ-র ভিত আরও মজবুত, নীতীশের ভাবমূর্তি আরও স্থায়ী: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতীশের ব্র্যান্ড এখন ভোটের চেয়েও বড়। দল বা জোটের মুখ হিসেবে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাঁর প্রশাসনিক ভাবমূর্তি বিহারের ভোটারদের মধ্যে স্থায়ী আস্থা তৈরি করেছে। তাই ভোটে না লড়েও তাঁকে চায় এনডিএ, চায় দল, চায় বিহার। এটাই তাঁর সফল ‘নন প্লেয়ার’ ক্যাপ্টেন্সির গোপন রহস্য।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত