নিপা ভাইরাস ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ, আর সেই চাপের মধ্যেই সংক্রমণ ঠেকাতে আরও কঠোর পথে হাঁটল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজনদের জন্য এবার ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন, দিন দু’বার উপসর্গ পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক আইসোলেশন ও RTPCR টেস্ট—সব মিলিয়ে জারি হল একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি বুঝে ব্যক্তিদের ‘হাই রিস্ক’ ও ‘লো রিস্ক’—এই দুই ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট করণীয় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনও ফাঁক না থেকে যায় নজরদারিতে।
স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, নিপা সংক্রমণ মোকাবিলায় শ্রেণিবিন্যাস (Risk Classification), নজরদারি (Surveillance), কোয়ারেন্টিন, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীর চিকিৎসা কীভাবে হবে, কোন পরিস্থিতিতে কোন ওষুধ ব্যবহার করা হবে—তা-ও বিস্তারিতভাবে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।


কারা ‘হাই রিস্ক’?—উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য সবচেয়ে কড়া নিয়ম
স্বাস্থ্য দফতরের মতে, যাঁরা নিশ্চিত নিপা আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছেন অথবা ল্যাব-পরীক্ষা ছাড়াই মৃত/সম্ভাব্য নিপা আক্রান্ত ব্যক্তির দেহরস (রক্ত, প্রস্রাব, বমি, লালা, শ্বাসনালীর নিঃসরণ) স্পর্শ করেছেন—তাঁদের হাই রিস্ক হিসেবে ধরা হবে।
এছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধ জায়গায় বা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে টানা ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাটালে সেই ব্যক্তিকেও হাই রিস্ক তালিকায় রাখা হবে।
উপসর্গ না থাকলেও ২১ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক
লক্ষণহীন হাই রিস্ক ব্যক্তিদের শেষ সংস্পর্শের সময় থেকে ২১ দিন বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এই সময়—


-
স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনে দু’বার নির্দিষ্ট চেকলিস্ট অনুযায়ী নজরদারি করবেন
-
প্রতিদিন ফোনে যোগাযোগ রেখে সক্রিয় পর্যবেক্ষণ চলবে
যে উপসর্গ দেখা দিলেই হাসপাতালে আইসোলেশন + RTPCR
কোয়ারেন্টিন চলাকালীন যদি দেখা দেয়—
-
জ্বর
-
অতিরিক্ত ক্লান্তি
-
পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা
-
বমি
-
মানসিক অবস্থার পরিবর্তন
-
খিঁচুনি
-
কাশি, শ্বাসকষ্ট
-
ডায়রিয়া
তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবিলম্বে নির্দিষ্ট আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করে দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে RTPCR পরীক্ষা করতে হবে।
কারা ‘লো রিস্ক’?—কম ঝুঁকির তালিকায় কারা পড়বেন
যাঁরা আক্রান্ত ব্যক্তির পোশাক, চাদর বা অন্য কোনও ফোমাইট (সংক্রমণ বহনকারী জড় বস্তু) স্পর্শ করেছেন, অথবা দেহরসের সংস্পর্শ ছাড়া সাধারণ শারীরিক সংস্পর্শে এসেছেন—তাঁদের লো রিস্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
লো রিস্ক হলে কী নিয়ম?
-
উপসর্গহীন ব্যক্তিদের শেষ সংস্পর্শের পর ২১ দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে
-
নির্দিষ্ট সময় শেষে রুটিন টেস্টের প্রয়োজন নেই
-
তবে উপসর্গ দেখা দিলেই আইসোলেশন + পরীক্ষা বাধ্যতামূলক
স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশ, লো রিস্ক সংস্পর্শে থাকা লক্ষণহীন স্বাস্থ্যকর্মীরা যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম—বিশেষ করে N95 মাস্ক ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
বিশেষ নির্দেশ: কেমোপ্রোফাইল্যাক্সিস এবং প্রতিরোধমূলক ওষুধ
যাঁরা পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা ছাড়া হাই রিস্ক সংস্পর্শে এসেছেন বা ঘনিষ্ঠ পরিচর্যাকারী ছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কেমোপ্রোফাইল্যাক্সিস দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায়—
-
রিবাভিরিন 600mg দিনে দু’বার 14 দিন দেওয়ার সুপারিশ
-
বিকল্প হিসেবে ফ্যাভিপিরাভির ব্যবহার করা যেতে পারে
তবে নির্দেশিকায় স্পষ্ট, যাঁরা যথাযথভাবে PPE ব্যবহার করেছেন, তাঁদের ‘কনট্যাক্ট’ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
চিকিৎসা নির্দেশিকা: কারা অ্যান্টিভাইরাল পাবেন?
যাঁদের RTPCR পরীক্ষায় নিপা পজিটিভ এবং যাঁরা উপসর্গযুক্ত—তাঁদের ক্ষেত্রে দ্রুত অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
চিকিৎসায় সম্ভাব্য ব্যবস্থাপনা হিসেবে বলা হয়েছে—
-
রেমডিসিভির + রিবাভিরিন, অথবা
-
রেমডিসিভির + ফ্যাভিপিরাভির
ডোজ কীভাবে হবে?
রিবাভিরিন
-
প্রথম দিনে 2 গ্রাম লোডিং ডোজ
-
পরবর্তী ৯ দিন দিনে দু’বার 1.2 গ্রাম
ফ্যাভিপিরাভির
-
প্রথম দিন 1600mg দিনে দু’বার
-
দ্বিতীয় দিন থেকে দশম দিন পর্যন্ত 800mg দিনে দু’বার
রেমডিসিভির
-
স্যালাইনে মিশিয়ে শিরায় প্রয়োগ
-
প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন ও বয়স অনুযায়ী ডোজ নির্ধারিত হবে
উন্নত চিকিৎসা: প্রয়োজনে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপিও
বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদন এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি থেরাপি ব্যবহারের কথাও নির্দেশিকায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে—
-
ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ
-
নিউরোলজিস্ট
-
একাধিক বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসা
—এই সমন্বিত ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
ডিসচার্জের নিয়ম আরও কঠোর: একাধিক নমুনায় পরপর নেগেটিভ দরকার
অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর প্রতি ৫ দিন অন্তর RTPCR পরীক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে। রোগী ক্লিনিক্যালি স্থিতিশীল হলে এবং ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে—
-
গলা থেকে নেওয়া সোয়াব
-
প্রস্রাব
-
রক্ত
এই তিন ধরনের নমুনায় পরপর দু’বার নেগেটিভ রিপোর্ট এলে তবেই ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
ছাড়া পাওয়ার পরেও রোগীকে ৯০ দিন নিয়মিত ফলো-আপে রাখতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



