কারাকাস যখন গভীর ঘুমে, তখনই আকাশপথে নেমে এল ইতিহাসের ছায়া। ভেনেজ়ুয়েলার রাজধানীতে শুক্রবার গভীর রাতে যে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, তা শুধু লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতেই নয়—বিশ্ব নিরাপত্তা মানচিত্রেও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। সূত্রের দাবি, এই অভিযানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের সঙ্গে যুক্ত ছিল পেন্টাগনের কুখ্যাত ‘নাইট স্টকার্স’ হেলিকপ্টার ইউনিট—যে বাহিনী এক দশক আগে ওসামা বিন লাদেন হত্যার সময়ও অন্ধকারেই যুদ্ধ জয় করেছিল।
মার্কিন সেনার এই গোপন অভিযানের সময় কার্যত অন্ধকারে ঢেকে ফেলা হয়েছিল গোটা কারাকাস। জানা যাচ্ছে, আগাম প্রস্তুত রাখা হয়েছিল অন্তত ১৫০টি সামরিক বিমান। সেই তালিকায় ছিল এফ-২২, এফ-৩৫, এফ-১৮, ইএ-১৮, ই-২ এবং বি-১ বম্বারের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি মোতায়েন ছিল ড্রোনও। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন আমেরিকার জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ ড্যান কেন।


‘নাইট স্টকার্স’—আনুষ্ঠানিক নাম ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্ট—গঠিত হয়েছিল আশির দশকের গোড়ার দিকে। ১৯৮০ সালে ইরানে বন্দি উদ্ধারের অপারেশন ‘ঈগল ক্ল’ ব্যর্থ হওয়ার পরই পেন্টাগন উপলব্ধি করে, রাতের অন্ধকারে নিখুঁত বিমান অভিযানের জন্য বিশেষ দক্ষ বাহিনী প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষিতেই ১৯৮১ সালে তৈরি হয় এই ইউনিট, যাদের মূল শক্তি—নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অন্ধকারেও আকাশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাবে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে আকাশপথে সহায়তা করাই এই বাহিনীর প্রধান কাজ। দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে এলে যখন সাধারণ বিমানবাহিনী কার্যত অচল, তখনই ‘নাইট স্টকার্স’ হয়ে ওঠে পেন্টাগনের নির্ভরযোগ্য অস্ত্র।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তাঁরই প্রাসাদ থেকে সস্ত্রীক আটক করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার অভিযানে এই ইউনিট যুক্ত ছিল বলেই দাবি করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে ওয়াশিংটন বা পেন্টাগনের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনও স্বীকৃতি মেলেনি। তবে কারাকাসে যেভাবে রাতের অন্ধকারে নিখুঁত ছক কষে অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে ‘নাইট স্টকার্স’-এর পরিচিত কৌশলের সঙ্গেই মিল খুঁজে পাচ্ছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।


এই প্রথম নয়। কয়েক মাস আগেও ভেনেজ়ুয়েলার আশপাশে এই বিশেষ হেলিকপ্টার ইউনিটের সক্রিয়তা চোখে পড়েছিল। গত অক্টোবরে ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ক্যারিবিয়ান সাগরে মহড়া দিতে দেখা গিয়েছে ‘নাইট স্টকার্স’-এর হেলিকপ্টার। আশির দশকে যাদের নজর ছিল মূলত পশ্চিম এশিয়ায়, সাম্প্রতিক কালে তাদের কৌশলগত ফোকাস যে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ঘুরেছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট।
মাদুরোকে উৎখাতের পরিকল্পনা হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সেই জাল বুনেছে মার্কিন প্রশাসন। ২০২০ সালে আমেরিকার আদালতে মাদক-সন্ত্রাস-সহ একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত হন মাদুরো। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করে পাঁচ কোটি ডলার। দীর্ঘ পাঁচ বছরের ব্যর্থ চেষ্টার পরে অবশেষে সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হল বলে দাবি করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র—শুক্রবার গভীর রাতে মাদুরোর সেফ হাউসে ঢুকে তাঁকে সস্ত্রীক আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।







