নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন (Nandigram Bypoll) ঘিরে শুক্রবার একের পর এক নাটকীয় মোড়। প্রথমে তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন-সম্পর্কিত একটি পুরনো খুনের মামলায় মিলনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। শুক্রবারের ঘটনাপ্রবাহে সেই ভোট আরও বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। মমতা-শিবিরের প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরেই মিলন প্রধানের গ্রেফতারিকে ঘিরে কংগ্রেস এবং তৃণমূলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে।
মিলন প্রধানকে যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী আন্দোলনের সময়কার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের আইনি দিক এখনও আদালতে বিচারাধীন বলেই বিষয়টিকে রাজনৈতিক অভিযোগ থেকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। শনিবার তাঁকে হলদিয়া আদালতে হাজির করানোর সম্ভাবনার কথাও রিপোর্টে উঠে এসেছে।
এই গ্রেফতারের সময় নিয়েই মূল রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমর্থন ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলটির নেতারা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেছেন। তবে এই অভিযোগকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে; গ্রেফতারির আইনি ভিত্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের প্রক্রিয়াতেই হবে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মিলন প্রধানের গ্রেফতারিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, ঘটনাটি কাকতালীয় নয় এবং বিজেপি নির্বাচনী লড়াইয়ের বদলে বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করতে চাইছে। কংগ্রেস ভয় পাবে না বা মাথা নত করবে না বলেও জানান তিনি।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে (Mallikarjun Kharge)-ও গ্রেফতারি নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীর গ্রেফতার ভোটের লড়াইকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। তদন্তকারী সংস্থার অপব্যবহারের অভিযোগও তুলেছে কংগ্রেস। এই অভিযোগগুলির কোনওটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের ইনচার্জ প্রকাশ জোশিকেও (Prakash Joshi) পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে বলে খবর। শুক্রবার রাতে তিনি কলকাতায় পৌঁছন। দলের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার কথা রয়েছে।
নন্দীগ্রামে মমতার সমর্থনের সিদ্ধান্তটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পর মমতা প্রকাশ্যে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা জানান। মমতা-শিবিরের এই সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে। তবে কংগ্রেসের তরফে মমতার সমর্থন চাওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও দলের নেতাদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের এই সমীকরণ তৈরি হয়েছে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর। কমিশন মমতা-শিবিরকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুটবল প্লেয়ার’ প্রতীক দিয়েছে। ফলে পুরনো ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ছাড়াই এই উপনির্বাচনে নতুন পরিচয়ে লড়াই করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিবিরকে।
অন্যদিকে নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন হাসিরানি রথ, যিনি শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত ঘনিষ্ঠ সহযোগীর মা। ফলে তৃণমূলের প্রার্থী প্রত্যাহার, কংগ্রেসকে মমতার সমর্থন এবং তার পরেই মিলন প্রধানের গ্রেফতার—এই তিনটি ঘটনা ভোটের আগে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এখন নজর থাকবে মিলন প্রধানের মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশলের দিকে। একইসঙ্গে ৬ অক্টোবরের ভোটে মমতা-সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থীকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই নতুন সমীকরণ কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও জোর চর্চা শুরু হয়েছে। আপাতত নন্দীগ্রামে ভোটের আগেই রাজনীতির উত্তাপ চরমে।



