কলকাতায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শতবর্ষের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে স্পষ্ট ও বিতর্কিত অবস্থান নিলেন সংঘপ্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর দাবি, ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র—এটি কোনও রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সত্য। এই সত্যের জন্য সংবিধানের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
ভাগবত তাঁর বক্তব্যে বলেন, কিছু সত্য এমনই, যা আলাদা করে স্বীকৃতি চায় না। তাঁর তুলনায়, যেমন সূর্য পূর্ব দিক থেকেই ওঠে—তার জন্য আলাদা কোনও সাংবিধানিক অনুমোদন লাগে না। তেমনই ভারত হিন্দু রাষ্ট্র—এটিও স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতা। তাঁর মতে, যত দিন পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে এমন মানুষ থাকবেন, যাঁরা ভারতকে মাতৃভূমি বলে মানেন এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করেন, তত দিন ভারত হিন্দু রাষ্ট্রই থাকবে।


সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে সংঘপ্রধান বলেন, সংসদ যদি ভবিষ্যতে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করতেও চায় বা না-চায়, তাতে সংঘের অবস্থান বদলাবে না। কারণ, হিন্দুত্ব কোনও আইনি পরিভাষার উপর নির্ভরশীল নয়। তিনি একই সঙ্গে বর্ণব্যবস্থা নিয়ে প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করে বলেন, জন্মভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা হিন্দুত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয়।
এই সভাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কারণ, তার আগের দিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলা সফরে ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় এসে ভাগবত স্পষ্ট করে দেন, সংঘের সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ নন, বরং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-কেই তাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন।
ভারতের ইতিহাস প্রসঙ্গে ভাগবত বলেন, ইংরেজরা আসার অনেক আগেই নানা জাতিগোষ্ঠী ও শাসক এই দেশে এসেছিল। কিন্তু তাঁর মতে, শক, হুণ, পাঠান বা মুঘল—কেউই ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম হতে পারেনি। তিনি তাঁদের ‘হানাদার’ হিসেবেই উল্লেখ করেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক মহলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


বক্তৃতায় উঠে আসে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রসঙ্গও। সংঘপ্রধান স্মরণ করিয়ে দেন, এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল নাগপুরে এবং এই গান একসময় ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যেও ভয় তৈরি করেছিল।
কলকাতার এই বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ-এর আদর্শিক অবস্থান আরও একবার প্রকাশ্যে এল। একই সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, সংবিধান ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিল সংঘপ্রধানের এই মন্তব্য।







