‘ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা নয়’, মুম্বইয়ের মঞ্চে মোহন ভাগবতের মন্তব্যে নতুন বার্তা

অল ইন্ডিয়া বিহার সেবা গোষ্ঠীর ১৪তম সম্মেলনে মোহন ভাগবত বলেন, রাষ্ট্র ও ধর্ম পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্য বিশ্বের নানা সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতের রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর প্রধান মোহন ভাগবত। শুক্রবার, ২ অক্টোবর মুম্বইয়ে অল ইন্ডিয়া বিহার সেবা গোষ্ঠীর ১৪তম সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয় ঐতিহ্যে ‘রাষ্ট্র’ এবং ‘ধর্ম’কে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ধর্মকে ধারণ করা এবং ধর্ম রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

ভাগবতের বক্তব্যে ‘ধর্ম’ বলতে শুধু কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় বা উপাসনা-পদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে কি না, সেই ব্যাখ্যাটি আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। অনুষ্ঠানে তিনি ভারতের বৃহত্তর জ্ঞান ও মূল্যবোধের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গও টেনেছেন এবং ধর্মকে দায়িত্ব, নীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য রেখেছেন।

মোহন ভাগবতের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও ধর্ম পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। তাঁর কথায়, রাষ্ট্র দুর্বল হলে ধর্ম বিপদের মুখে পড়ে এবং ধর্মের চর্চা দুর্বল হয়ে গেলে রাষ্ট্রেরও অবনতি ঘটে।

এই কারণেই দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন RSS প্রধান। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ককে ভারতীয় ঐতিহ্যের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে শুধু ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়, বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার কথাও বলেন ভাগবত। উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারিবারিক জীবন এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংঘাত—এই বিষয়গুলির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একদিকে উন্নয়ন বাড়লে পরিবেশের উপরে চাপ তৈরি হয়। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এলে উন্নয়নের গতিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একইভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসারের সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।

ভাগবত মনে করেন, এই ধরনের দ্বন্দ্বের সমাধান কোনও একটি দিককে বেছে নিয়ে অন্যটিকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্যে ভারসাম্য ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন RSS প্রধান। তাঁর দাবি, ভারত ঐতিহাসিকভাবে অন্য দেশ জয় বা ধর্মান্তরের মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ছড়ায়নি; বরং জ্ঞান ও শান্তির পথ ভাগ করে নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে ভারতের দীর্ঘ জ্ঞান-ঐতিহ্যের একাধিক উৎসের নাম উল্লেখ করেন তিনি। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, ভগবদ্গীতা, জৈন আগম, ত্রিপিটক এবং গুরু গ্রন্থ সাহিবের পাশাপাশি বিভিন্ন সাধু-সন্তের শিক্ষার কথাও বলেন ভাগবত।

তাঁর বক্তব্য, ভারতের কাছে এমন একটি বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডার রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের প্রয়োজন। এই জ্ঞানকে কেবল সংরক্ষণ নয়, জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার উপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

ভাগবতের বক্তব্যে ভারতের আন্তর্জাতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে আসে। তাঁর দাবি, বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংকটের মধ্যে ভারতীয় চিন্তাধারা থেকে সমাধানের পথ পাওয়া যেতে পারে বলে বিশ্বের একাংশ মনে করে।

তিনি বলেন, ভারতের ঐতিহ্যের মধ্যে বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বিভিন্ন মত ও দর্শনের সহাবস্থানের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে বক্তব্যে ইঙ্গিত দেন RSS প্রধান।

মুম্বইয়ের ওই সম্মেলনে ভাগবতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ এবং ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক। ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা নয়, বরং পরস্পর নির্ভরশীল হিসেবে দেখার তাঁর ব্যাখ্যাই এ দিনের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন