ভারতের গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প MGNREGA-র ক্ষেত্রে ১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে বহু দিন ধরেই রাজ্য–কেন্দ্রের সংঘাত প্রকাশ্যে। তৃণমূল কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করেছে যে কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলার প্রাপ্য অর্থ আটকে রেখে শ্রমিকদের জীবন ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। এবার সেই অভিযোগ যে রাজনৈতিক কল্পনা নয়, তা স্পষ্ট হয়ে গেল কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসিয়াল নথিতেই।
লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি লিখিত প্রশ্নে জানতে চান—২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কোন রাজ্যের কত টাকা বকেয়া রয়েছে এবং কোন রাজ্যের দাবি কতদিনে মিটেছে। সেই প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান বিস্ফোরক পরিস্থিতি সামনে নিয়ে এসেছে।
১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা: বাংলাকে এক টাকাও দেওয়া হয়নি, অভিষেকের প্রশ্নে কেন্দ্রের স্বীকারোক্তি
প্রতিমন্ত্রী কমলেশ পাসওয়ান সংসদে স্পষ্ট জানান, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত সব রাজ্যের বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে, বাংলা ছাড়া। অর্থাৎ, কেন্দ্র প্রথমবার সরকারি নথিতে স্বীকার করল যে বাংলার ১০০ দিনের কাজের টাকা বকেয়া রেখে দেওয়া হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। চলতি অর্থবর্ষ ২০২৫–২৬-এর জন্য যে অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয়েছে—প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ফান্ড—সেখানেও বাংলার নাম নেই। অথচ অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৬৯ হাজার কোটিরও বেশি টাকা পেয়ে গেছে।
সংসদে পাসওয়ান দাবি করেন, শ্রমিকদের মজুরি প্রতিদিনের ভিত্তিতে সরাসরি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় এবং রাজ্যের দাবি অনুযায়ী বরাদ্দ হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চালু কাজ থাকা সত্ত্বেও ১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা বাংলার শ্রমিকদের দুর্দশা আরও বাড়িয়েছে।
রাজ্যের অভিযোগ আরও গুরুতর। তৃণমূল জানাচ্ছে, বাংলার মোট প্রাপ্য প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। অথচ কেন্দ্র অ্যাকশন টেকেন রিপোর্টের অধীনে বারবার ফাইল ঝুলিয়ে রেখে অর্থ পাঠাচ্ছে না। এর মধ্যেই কলকাতা হাই কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—বাংলার সব বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিতে হবে কেন্দ্রকে। কিন্তু আদালত নির্দেশের পরেও পরিস্থিতির বদল হয়নি।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অস্ত্রেও পরিণত হয়েছে। লোকসভা অধিবেশন শুরু হওয়া মাত্রই তৃণমূল এই ইস্যুতে তীব্র আক্রমণ শানায়। কেন্দ্রের নথিতে বঞ্চনার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি সেই দাবি আরও শক্তিশালী করে তুলল।
অন্যদিকে কেন্দ্রের যুক্তি—বাংলা প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার নিয়মভঙ্গ করেছে। এজন্যই টাকা আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি নিয়মভঙ্গই সমস্যা হয়, তবে আদালতের নির্দেশের পরেও কেন টাকা ছাড় নেই, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই কেন্দ্রের কাছে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলা এই প্রকল্পে বাংলাকে শূন্য বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের দেওয়া এই সর্বশেষ তথ্য রাজ্য–কেন্দ্র সম্পর্কের জটিলতা আরও স্পষ্ট করছে।
১০০ দিনের কাজে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে এই প্রথম সরাসরি ‘স্বীকারোক্তি’ দিল কেন্দ্র, যা রাজনৈতিক অঙ্গনকে নতুন করে গরম করে তুলেছে।



