আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ক্রুড তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ইরান-আমেরিকা সংঘাতের অবসান এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির পর ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ৮০ ডলারের নীচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন— এবার কি দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমবে?
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের জ্বালানির বাজারে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭৮.৬৬ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ ইরান-আমেরিকা সংঘাতের চরম সময়ে ভারতকে একই তেল ১১৫ থেকে ১২৫ ডলার পর্যন্ত দামে কিনতে হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই স্বস্তিদায়ক।
তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কম ছিল। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভারত ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭০.৭০ ডলার দামে ক্রুড তেল আমদানি করেছিল। অর্থাৎ বর্তমান দাম যুদ্ধকালীন সময়ের তুলনায় কম হলেও, যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে এখনও পৌঁছায়নি।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল। মার্চ মাসে এক পর্যায়ে ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৪৬ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এপ্রিল ও মে মাসেও ভারতকে যথাক্রমে প্রায় ১১৪ এবং ১০৬ ডলার দরে তেল কিনতে হয়েছে, যা আমদানি ব্যয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছিল দেশের জ্বালানি বাজারে। যদিও যুদ্ধের প্রথম দিকে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি, পরে কয়েক দফায় মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে তেল বিপণন সংস্থাগুলির ক্ষতির কিছুটা বোঝা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও এখনই পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কারণ যুদ্ধের সময় সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বর্তমান কম দামের বাজারে তারা সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারও অতীতে জ্বালানির উপর শুল্ক কমিয়ে রাজস্বে কিছুটা ঘাটতির মুখে পড়েছিল। ফলে তেলের দাম কমে গেলেই অবিলম্বে খুচরো বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্রুড তেলের দাম নিম্নমুখী থাকলে ভবিষ্যতে পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমানোর বিষয়ে সরকার এবং তেল সংস্থাগুলি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জ্বালানির দাম কমলে পরিবহণ ব্যয় কমবে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপও হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সুতরাং, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার খবর স্বস্তির হলেও, পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার জন্য এখনও কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।



