প্রায় তিন দশকের অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে আরও এক বড় সম্মান পেলেন রানি মুখার্জি (Rani Mukerji)। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় (La Trobe University) তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অফ লেটার্স’ বা ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করেছে। শাহরুখ খানের (Shah Rukh Khan) পর রানি হলেন দ্বিতীয় ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি এই সম্মান পেলেন। মেলবোর্ন ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আবহে ফেডারেশন স্কোয়ারে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে অভিনেত্রীর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়।
এই স্বীকৃতিতে স্বাভাবিক ভাবেই আপ্লুত রানি। তাঁর কাছে এটি শুধু অভিনয়জীবনের পুরস্কার নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সম্মান পাওয়ার পর অভিনেত্রী জানান, ছোটবেলায় অন্য অনেক শিশুর মতো তাঁরও স্বপ্ন ছিল পরিবার এবং দেশকে গর্বিত করা। কীভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করবেন, তখন জানতেন না। তবে নিজের কাজে নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম করার সংকল্প ছিল।
শেষ পর্যন্ত অভিনয়ই হয়ে ওঠে সেই স্বপ্নপূরণের রাস্তা। দীর্ঘ কেরিয়ারে একের পর এক চরিত্রে অভিনয় করে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর অভিনেত্রী। বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি ভিন্নধর্মী এবং সামাজিক বার্তাবাহী ছবিতেও নিজেকে বারবার মেলে ধরেছেন তিনি।
নিজের কেরিয়ার সম্পর্কে বলতে গিয়ে রানি জানিয়েছেন, শুরু থেকেই ঝুঁকি নিতে ভয় পাননি। কোনও ছবিতে অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গল্পটি তাঁর নিজের মনকে স্পর্শ করছে কি না, সেটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে গল্প বলা প্রয়োজন এবং যা দর্শককে ভাবতে, অনুপ্রাণিত করতে কিংবা ক্ষমতায়িত করতে পারে, সেই ধরনের কাজকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
নারীকেন্দ্রিক গল্পের ক্ষেত্রেও রানির অবদান আলাদা করে উল্লেখ করেছে লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়। অভিনেত্রীর মতে, নীরবে কাজ করে তিনি বরাবর ভারতীয় নারীদের শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং স্বতন্ত্র পরিচয়কে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মাধ্যমে সমাজের নানা স্তরে থাকা মেয়েদের গল্প দর্শকের সামনে এসেছে।
অভিনয়ের বাইরে মানবিক কাজের প্রতিও তাঁর দায়বদ্ধতার কথা উঠে এসেছে এই সম্মাননা অনুষ্ঠানে। অভাব, বিপদ কিংবা প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন রানি। তাঁর বিশ্বাস, এই সম্মান আগামী দিনেও আরও দায়িত্বশীল ভাবে কাজ করে যাওয়ার প্রেরণা দেবে।
ডি.লিট সম্মানটি নিজের জন্য রেখে না দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা দর্শকদের উৎসর্গ করেছেন অভিনেত্রী। একজন ভারতীয় হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের দেশ, সংস্কৃতি এবং ভারতীয় সিনেমাকে এভাবে সম্মানিত হতে দেখে গর্বিত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রানির বক্তব্যে উঠে এসেছে সিনেমার শক্তির কথাও। তাঁর মতে, গল্পের কোনও সীমান্ত নেই। একটি ভালো গল্প ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের মানুষকে একে অপরের কাছাকাছি আনতে পারে। চলচ্চিত্র তাই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ এবং বন্ধুত্ব তৈরিরও শক্তিশালী মাধ্যম।
লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর জন ব্রাম্বি (John Brumby) রানির দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিনেত্রীর কাজ শুধুমাত্র বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন ছবিতে তাঁর অভিনয় সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
মানবিক কাজের প্রতি রানির দায়বদ্ধতার কথাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ এবং মানুষের পাশে থাকার মানসিকতাই তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেটের যোগ্য প্রাপক করে তুলেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।
শাহরুখ খানের পর দ্বিতীয় ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই আন্তর্জাতিক সম্মান পাওয়ায় রানির কেরিয়ারে নিঃসন্দেহে যোগ হল আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। প্রায় ৩০ বছরের অভিনয়যাত্রায় একের পর এক সাফল্যের পর এবার অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট সম্মান তাঁর মুকুটে নতুন পালক হয়ে রইল।



