জাতীয় পতাকার ইতিহাসে ১৭ বদল! স্বাধীনতার আগে কী ভাবে তৈরি হল আজকের তেরঙ্গা

১৯০৬ সালে কলকাতায় প্রথম ভারতীয় পতাকা উত্তোলন থেকে ১৯৪৭ সালে বর্তমান তেরঙ্গা গ্রহণ—জাতীয় পতাকার নকশা কী ভাবে বদলেছে, স্বাধীনতা দিবসের আগে জানুন সেই ইতিহাস।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

স্বাধীনতা দিবসের (Independence Day) আবহে জাতীয় পতাকা মানেই আবেগ, গর্ব এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু আজ যে তেরঙ্গাকে আমরা ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে জানি, সেটি একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকার নকশা ও প্রতীকে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯০৬ সালে কলকাতায় প্রথম ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের পর ১৯১৭, ১৯২১, ১৯৩১ হয়ে ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপটি অনুমোদিত হয়।

এই দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে আলাদা ভাবে গবেষণা করেছিলেন আসানসোলের প্রাক্তন রেলকর্মী কালীশংকর ভট্টাচার্য। পতাকা নিয়ে তাঁর সংগ্রহ ও গবেষণায় দেশ-বিদেশের জাতীয়, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পতাকার নানা নকশা উঠে এসেছে বলে পরিবারের দাবি। তাঁর সংগ্রহে ভারতের জাতীয় পতাকার বিভিন্ন পর্যায়ের মডেলও সংরক্ষিত রয়েছে।

তবে জাতীয় পতাকার ইতিহাসের সূচনাবিন্দু নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৩ নয়, ১৯০৬ সালের ৭ অগস্ট কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে প্রথম ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কথা স্বীকৃত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পতাকাটি ছিল লাল, হলুদ ও সবুজ—তিনটি অনুভূমিক অংশে বিভক্ত।

উপরের লাল অংশে ছিল আটটি পদ্ম, মাঝের হলুদ অংশে লেখা ছিল ‘বন্দে মাতরম’ এবং নীচের সবুজ অংশে সূর্য ও অর্ধচন্দ্রের প্রতীক ছিল। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের আবহে এই পতাকা জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই নকশায় কিছু পরিবর্তন এনে আরও কয়েকটি পতাকার ব্যবহার দেখা যায়।

১৯০৭ সালে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বার্তা দেশের বাইরেও পৌঁছে দেন মাদাম ভিকাজি কামা (Bhikaji Cama)। স্টুটগার্টে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে তিনি একটি তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন। সরকারি নথিতেও ১৯০৭ সালে দেশের বাইরে মাদাম কামার পতাকা উত্তোলনের উল্লেখ রয়েছে।

এরপর আসে ১৯১৭ সালের হোম রুল আন্দোলনের পতাকা। অ্যানি বেসান্ত (Annie Besant) ও বাল গঙ্গাধর তিলক (Bal Gangadhar Tilak)-এর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এই পতাকায় লাল ও সবুজের একাধিক স্ট্রাইপের পাশাপাশি সপ্তর্ষি নক্ষত্রমণ্ডলের প্রতীক, চাঁদ এবং কোণে ইউনিয়ন জ্যাক ছিল। এই পতাকা ভারতের স্বশাসনের দাবিকে তুলে ধরেছিল।

জাতীয় পতাকার বিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯২১ সালে। বিজয়ওয়াড়ায় কংগ্রেসের অধিবেশনে পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (Pingali Venkayya) একটি পতাকার নকশা নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) কাছে যান। প্রাথমিক নকশায় লাল ও সবুজ রং ছিল। পরে গান্ধীর পরামর্শে সাদা রং এবং চরকা যুক্ত হয়। এই নকশাই পরবর্তী সময়ে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে যায়।

১৯২১-এর এই পতাকা পরবর্তী কয়েক বছরে আরও জনপ্রিয় হয়। চরকা তখন শুধু স্বদেশি অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক ছিল না, স্বাধীনতার আন্দোলনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে উঠেছিল। জাতীয় পতাকার নকশায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐক্য ও দেশের বহুত্ববাদী চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল।

১৯৩১ সাল জাতীয় পতাকার ইতিহাসে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেই বছর গৈরিক, সাদা ও সবুজ—এই তিন রঙের পতাকা গ্রহণ করা হয় এবং মাঝখানে রাখা হয় চরকা। এই পতাকাটি বর্তমান তেরঙ্গার সরাসরি পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি তথ্যেও ১৯৩১ সালের পতাকাকে বর্তমান জাতীয় পতাকার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর আসে স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদ (Constituent Assembly) স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে বর্তমান তেরঙ্গাকে অনুমোদন করে। গৈরিক, সাদা ও সবুজ রং অপরিবর্তিত থাকলেও মাঝখানের চরকার জায়গা নেয় সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র। নীল রঙের এই অশোকচক্রে রয়েছে ২৪টি স্পোক।

আজকের জাতীয় পতাকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ৩:২। উপরে গভীর গৈরিক, মাঝে সাদা এবং নীচে গাঢ় সবুজ। সাদা অংশের কেন্দ্রে রয়েছে নেভি ব্লু অশোকচক্র। এই পতাকাই ১৫ অগস্ট ১৯৪৭ থেকে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে রয়েছে।

কালীশংকর ভট্টাচার্যের গবেষণা ও সংগ্রহের বিশেষত্ব এখানেই যে, জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত রূপে পৌঁছনোর আগে যে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নকশার পরিবর্তন ঘটেছিল, তার বিভিন্ন নিদর্শন তিনি সংরক্ষণ করে গিয়েছেন বলে পরিবারের দাবি। দেশ-বিদেশের শত শত পতাকা নিয়ে তাঁর গবেষণাও ছিল ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

তাঁর পরিবারের ইচ্ছা, আসানসোলে সংরক্ষিত এই গবেষণার সামগ্রী আরও বড় পরিসরে মানুষের সামনে তুলে ধরা হোক। জাতীয় পতাকার বিবর্তনের ইতিহাস শুধু একটি পতাকার নকশা বদলের গল্প নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি চেতনা, হোম রুল, গান্ধীর নেতৃত্ব, কংগ্রেসের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের আত্মপরিচয়। সেই কারণেই আজকের তেরঙ্গার প্রতিটি রং ও প্রতীকের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন