বছরের শুরু থেকে সোনার দামে বড় উত্থান দেখা না গেলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ সংস্থা J.P. Morgan। সংস্থার নতুন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার দাম ৬,০০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান স্তর থেকে যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৫ সালে সোনার দামে প্রায় ৬৫ শতাংশ উল্লম্ফনের পর চলতি বছরে বাজার অনেকটাই স্থির রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাস পার হলেও সোনার দাম প্রায় একই জায়গায় ঘোরাফেরা করছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম প্রায় ৪,৩০০ ডলারের আশেপাশে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে সোনার গতিপথে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তেলের দাম হু হু করে বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায়।
তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চস্তরে রাখতে পারে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়। আর সুদের হার বেশি থাকলে সাধারণত সোনার মতো সুদহীন সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যায়। ফলে গত কয়েক মাসে সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
J.P. Morgan-এর বেস ও প্রেশাস মেটালস বিভাগের প্রধান গ্রেগ শিয়ারারের মতে, বর্তমানে সোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল রেঞ্জের মধ্যে আটকে রয়েছে। ২০০ দিনের মুভিং অ্যাভারেজের উপরে থাকলেও ৫০ দিনের মুভিং অ্যাভারেজ ভাঙতে পারেনি। ফলে বাজারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব দেখা যাচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সোনার পক্ষে একাধিক ইতিবাচক কারণ কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমশ কমতে থাকা ক্রয়ক্ষমতা, মার্কিন সরকারের আর্থিক ঘাটতি, বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিভাজন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা— এই সমস্ত বিষয় ভবিষ্যতে সোনার চাহিদা বাড়াতে পারে।
এদিকে বাজারের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির দিকে। ১৯ জুন সুইৎজারল্যান্ডে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। চুক্তির আওতায় ইরানের উপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অবরোধ শিথিল এবং পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শান্তি চুক্তি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমতে পারে। ইতিমধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দুই মাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে এবং মার্কিন ডলার সূচকও দুর্বল হয়েছে। ডলারের দাম কমলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনা তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে ওঠে, যা চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা এখনই ঝুঁকি নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করছেন। MarketGauge-এর প্রধান বাজার কৌশলবিদ মিশেল স্নাইডারের মতে, সাম্প্রতিক মূল্য সংশোধন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
J.P. Morgan-এর অনুমান অনুযায়ী, যদি বর্তমান পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সোনার বাজারে বড় উত্থান দেখা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির ক্রমাগত সোনা কেনা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে সোনার দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।



