সঙ্গিনীকে সঙ্গে নিয়ে মনোনয়ন, ভারতের প্রথম ঘোষিত সমকামী সাংসদ হচ্ছেন মেনকা গুরুস্বামী

রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন ভারতের প্রথম ঘোষিত সমকামী সাংসদ, তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মেনকা গুরুস্বামী-কে রাজ্যসভায় প্রার্থী করে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাইলফলক গড়ল তৃণমূল কংগ্রেস। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। মনোনয়নের সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী অরুন্ধতী কাটজু। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন ভারতের ইতিহাসে প্রথম ঘোষিত সমকামী সাংসদ, যা দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

বৃহস্পতিবার কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য তিন প্রার্থীর সঙ্গে রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন ৫১ বছর বয়সি এই সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ। গোলাপি শার্ট, ধূসর ট্রাউজ়ার্স ও ছাইরঙা ব্লেজ়ারে সজ্জিত মেনকার মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসী হাসি। মনোনয়নের সময় তাঁর পাশে ছিলেন সঙ্গিনী অরুন্ধতী কাটজু, যার সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে একত্রবাস করছেন তিনি।

প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য অনেক সময়েই প্রগতিশীল হলেও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তা বাস্তবে রূপ পায় খুব কম। সেই জায়গাতেই প্রথমবারের মতো একটি বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল তৃণমূল কংগ্রেস। অনেকের মতে, বিজেপি শাসিত রাজনৈতিক পরিসরে এই সিদ্ধান্ত মতাদর্শগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মেনকার পারিবারিক পটভূমিও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত। তাঁর বাবা মোহন গুরুস্বামী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর মেনকা বলেন, “এটি আমার কাছে বিরাট সম্মানের বিষয়। একজন সংবিধান বিষয়ক আইনজীবী হিসেবে সংসদের উচ্চকক্ষে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্যিই গর্বের। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজ্যসভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা, সমতা এবং বৈষম্যহীনতার কথা বলে। সংসদে গিয়ে সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে চাই।”

আইনজীবী হিসেবে মেনকা গুরুস্বামী ইতিমধ্যেই দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আলোচিত নাম। বিশেষ করে সমকামিতাকে অপরাধের তালিকা থেকে সরানোর ঐতিহাসিক মামলা— ‘Navtej Singh Johar vs Union of India’-এ আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ সেই মামলায় রায় দিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার যে অংশ প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে সমকামী সম্পর্ককে অপরাধ বলত, তা বাতিল করে দেয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই মামলায় মেনকার যুক্তি ও আইনি বিশ্লেষণ আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

এছাড়াও আধার প্রকল্প ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংক্রান্ত ‘K.S. Puttaswamy vs Union of India’ মামলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এর পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার সংক্রান্ত মামলাতেও কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আইনি লড়াই করেছেন তিনি।

এতদিন সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল আদালতের পরিসরে। রাজ্যসভায় নির্বাচিত হলে সেই লড়াই এবার পৌঁছবে দেশের আইনসভায়— আর সেই পথ খুলে দিল তৃণমূল কংগ্রেস।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত