অর্ক সানা: তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়ার দিনই নতুন দল গড়ার ঘোষণা, প্রার্থী তালিকা প্রকাশ—সব মিলিয়ে হুমায়ুন কবীর রাজনীতির মূলস্রোতে আলোড়ন তুলেছেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা হাতে ধরা সিপিআইএম কেন এমন এক নেতার সঙ্গে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যার রাজনৈতিক আদর্শ বারবার বদলেছে? এই প্রশ্নের কেন্দ্রে উঠে আসছে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম—এবং ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
হুমায়ুন কবীরকে তৃণমূল সাসপেন্ড করার পরই সংবাদমাধ্যমে আসে তাঁর বক্তব্য—সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক নাকি জোটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই দাবি প্রকাশ্যে আসার পরও সেলিম একবারের জন্যও তা সরাসরি অস্বীকার করেননি। শুধু ফোনালাপেই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তিনি। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যে হুমায়ুন কখনও কংগ্রেস, কখনও বিজেপি, আবার কখনও তৃণমূলে থেকেছেন; যার রাজনৈতিক অবস্থান আদর্শগতভাবে ধোঁয়াটে—তার সঙ্গে সিপিআইএমের এই ‘ঢলাঢলি’ কেন?


হুমায়ুনের ‘বাবরি মসজিদ করবেন’—এই ঘোষণার পর মুসলমানদের দাবিদাওয়া পূরণের কথা বলে তিনি যে নতুন দল গড়েছেন, তার নাম ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’। নির্বাচন কমিশন এখনও ২০২৬-এর বিধানসভা ভোট ঘোষণা না করলেও, দল ঘোষণার দিনই প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করে দিয়েছেন হুমায়ুন। অর্থাৎ, তিনি যে ভোটের ময়দানে নামতে পুরোপুরি প্রস্তুত, তা স্পষ্ট। আর ঠিক এখানেই সিপিআইএমের কৌশল নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
আরও একটি দিক চোখে পড়ার মতো। সেলিম কেবল হুমায়ুনের দিকেই হাত বাড়াননি। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার-কেও কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরিয়ে জোটের বার্তা দিচ্ছেন। তিনি একপ্রকার বুঝিয়ে দিয়েছেন মুর্শিদাবাদ কংগ্রেস (পড়ুন অধীর চৌধুরী) সিপিআইএমের সঙ্গে জোট করতে চাইলেও এখনও কোন গ্রিন সিগন্যাল দিচ্ছেনা প্রদেশ কংগ্রেস।
সিপিআইএম সমর্থকদের একাংশ হয়তো ভাবছেন, রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম যে কোনও মূল্যে দলকে রাজ্যে প্রাসঙ্গিক করতে চাইছেন। কিন্তু একটু গভীরে গেলে ভিন্ন ছবি ধরা পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, এই লড়াই হয়তো সিপিআইএমকে বিধানসভায় ফেরানোর নয়; বরং সেলিমের নিজের বিধায়ক হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করার।


আমার লেখা একশ্রেনীর সিপিআইএম সমর্থকদের খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু তথ্য, পরিসংখ্যান বলছে দল সিপিআইএমকে নয়, ব্যাক্তি মহম্মদ সেলিম হুমায়ুন আর কংগ্রেস কে ধরে পৌঁছাতে চাইছেন রাজ্য বিধানসভায়। কিভাবে এটা বলা সম্ভব? বা বলছি? এবার একটু মন দিয়ে পড়ুন।
প্রথমে মহম্মদ সেলিমের রাজনৈতিক কেরিয়ারের দিকে তাকানো যাক। রাজ্যসভার সাংসদ (১৯৯০–২০০১), এন্টালি থেকে বিধায়ক ও মন্ত্রী (২০০১–২০০৪), কলকাতা উত্তর থেকে লোকসভার সাংসদ (২০০৪–২০০৯)—এরপর পরাজয়। ২০১৪-য় কলকাতা থেকে উত্তর দিনাজপুরের ‘রায়গঞ্জ’ পাড়ি দিয়ে সামান্য ভোটে জয়। দীপা দাসমুন্সীকে হারিয়ে সংসদে ফিরলেও ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ফের হার। এরপর ২০২১-এ কংগ্রেসকে ব্রিগেডের মঞ্চে কার্যত অপমান করে আব্বাস সিদ্দিকির সঙ্গে জোটের বার্তা দিয়ে হুগলীর চণ্ডীতলা বিধানসভা আসন থেকে প্রার্থী হয়ে পরাজয়। ২০২৪ লোকসভায় হুগলির চন্ডীতলা থেকে সোজা মুর্শিদাবাদ গমন—কংগ্রেস ও অধীর চৌধুরীর সমর্থন সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদ লোকসভা আসনে লক্ষাধিক ভোটে তৃণমূলের কাছে হার।
অর্থাৎ সিপিআইএমের প্রভাবশালী নেতার কেরিয়ারের দিকে তাকালেই দেখা যায় ১৯৯০ সালে দল তাকে প্রথমবার রাজ্যসভায় পাঠানোর পর থেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন, মহম্মদ সেলিম সবসময় চেয়েছেন ‘জনতার প্রতিনিধি’ হতে! সে রাজ্যের যেকোন প্রান্তে বা যে কোনও ধরনেরই নির্বাচন হোক না কেন!
এবার ২০২৬। সেলিমের নজর যে মুর্শিদাবাদের রানীনগর বিধানসভা কেন্দ্রে, তা স্পষ্ট। কারণ, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে তিনি হারলেও, রানীনগর বিধানসভা এলাকায় তিনি মাত্র ৭২১ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। এই কেন্দ্রটি হুমায়ুন কবীরের প্রভাবিত এলাকা। হুমায়ুন নির্দল হিসেবেও লড়লেও তৃণমূলের ভোটবাক্স থেকে ১৫–২০ হাজার ভোট কেটে নিতে পারেন—এ বাস্তবতা রাজনৈতিক মহল জানে। এখন তো আবার হুমায়ুনের সঙ্গে বাবরি মসজিদের সুড়সুড়ি আছে! সঙ্গে নয়া দল।
এখানেই সেলিমের ‘ট্রাম্প কার্ড’। সেলিম চাইছেন ২০২৪ লোকসভায় যেমন কংগ্রেসের সমর্থন পেয়েছিলেন সেটা থাক সঙ্গে হুমায়ুনের সমর্থন তিনি যদি পেয়ে যান তাহলে আর পায় কে। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিধায়ক হওয়া পাকা। শুধু হুমায়ুন আর কংগ্রেস কে কনভিনস করলেই খেলা শেষ। সে দল ‘সিপিআইএম’ উচ্ছন্নে গেল কি না গেল তাতে কি যায় আসে। এমনিতেই কোন কোন আসন নেই, তিনি জিতলে সেটা তো সিপিআইএমের নামেই লেখা হবে। তিনি তো আর হুমায়ুনের মত ‘গদ্দার’ নন যে দল বদলাবেন!!!
এই কারণেই প্রশ্নটা শুধু জোটের নয়। প্রশ্নটা হল—সিপিআইএমের আদর্শ বনাম একজন নেতার রাজনৈতিক টিকে থাকা। ২০২৬ সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে শেষ করার আগে চাইব আমার এই লেখা ভুল প্রামানিত হোক। হুমায়ুন ও কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিআইএমের জোট হল, কিন্তু সেলিম প্রার্থী হলেন না। প্রার্থী করা হল ঐ এলাকার অন্য কোন সিপিআইএম কর্মী বা নেতাকে। তবে আমি নিশ্চিত সেটা হবে না। যদি হুমায়ুন আর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সফল হয় তবেই লড়বেন সেলিম, নাহলে নৈব নৈব চ… আমার অন্তত সেটাই বিশ্বাস।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



