ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি কমিশনকে ‘টর্চার কমিশন’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন— বেআইনি ভাবে লগ-ইন ব্লক, লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ, আধিকারিকদের সাসপেন্ড এবং সংখ্যালঘু-গরিবদের টার্গেট করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাসপেন্ড হওয়া নির্বাচনী আধিকারিকদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “জনগণই সরকার নির্বাচন করে। কমিশন কি ঠিক করবে কে সরকার গড়বে?” তাঁর অভিযোগ, কমিশনের আচরণ “তুঘলকি” এবং এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে সুবিধাজনক। হরিয়ানা, বিহার ও মহারাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন— বিহারে যেসব নথি গ্রহণযোগ্য, বাংলায় সেগুলি কেন বাতিল হচ্ছে?



নথি বিতর্কে তোপ
মমতার দাবি, বিহারে পাসপোর্ট ছাড়াও রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত পরিচয়পত্র, পেনশন পেমেন্ট অর্ডার, ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিস-এলআইসি নথি, জন্ম শংসাপত্র, এমনকি ফ্যামিলি রেজিস্টারও গ্রহণযোগ্য। “ওই রাজ্যে যদি গ্রাহ্য হয়, বাংলায় হবে না কেন?”— প্রশ্ন তাঁর। ফরেস্ট রাইটস সার্টিফিকেট বা সরকার প্রদত্ত জমি-বাড়ির নথি নিয়েও একই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
লগ-ইন ব্লক ও সুপ্রিম কোর্ট
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুনানির সময়সীমা দিলেও তার আগেই বিকেল ৩টায় লগ-ইন ব্লক করে দেওয়া হয়, ফলে প্রায় এক লক্ষ মানুষ শুনানিতে অংশ নিতে পারেননি। “এটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য,” বলেন তিনি।
‘৫৮ লক্ষ নাম বাদ’ অভিযোগ
মমতা দাবি করেন, “৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।” বিজেপির আইটি সেলের ভূমিকার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর “বড় জালিয়াতি” সামনে আসতে পারে। ড্যাশবোর্ডে আপলোড করা নাম ‘এরর’ দেখিয়ে বাতিল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর।


আধিকারিকদের সাসপেন্ড প্রসঙ্গ
ইআরও ও অন্যান্য আধিকারিকদের সাসপেন্ড করা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন— “আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে?” তাঁর বক্তব্য, তদন্তের আগেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার সৌজন্যের খাতিরে ব্যবস্থা নিলেও অভিযুক্তদের উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত রাখা হবে। “কমিশন যদি ডিমোশন দেয়, আমরা প্রমোশন দেব,” মন্তব্য করেন তিনি।
‘থ্রেট কালচার’ ও কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক
মমতার অভিযোগ, ডিএম, বিডিও, পুলিশ-সহ প্রশাসনিক কর্তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার আগে কমিশনের এমন সক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর কথায়, “ক্ষমতারও সীমা আছে।” কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের চেষ্টা হলে প্রতিবাদ হবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু
বিহারে প্রকাশ্যে মাছ-মাংস বিক্রি নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, “বাংলায় এমন রাজনীতি চলবে না।” অনুপ্রবেশ, রোহিঙ্গা, সীমান্ত নিরাপত্তা, মণিপুর পরিস্থিতি, এমনকি জাতীয় স্তরের বিভিন্ন ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
একাধিক BLO-র মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে দায় নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। “আইন সবার জন্য সমান,”— মন্তব্য তাঁর।
শেষ বার্তা
মমতা বলেন, “আমরা আইন মেনে চলব। কিন্তু সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে এলে চুপ করে থাকব না।” বৈধ ভোটারদের নাম অক্ষত রেখে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি।







