মমতার ‘হাদি’ মন্তব্য নিয়ে মামলা খারিজ, আদালতে রাজ্যের রিপোর্টে কী জানানো হল?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাদি মন্তব্য নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলা খারিজ করল কলকাতা হাই কোর্ট। রাজ্যের রিপোর্টে বলা হয়, ওই মন্তব্যে কোনও আদালতগ্রাহ্য অপরাধ সংঘটিত হয়নি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) বাংলাদেশি নাগরিক শরিফ ওসমান হাদি প্রসঙ্গে করা মন্তব্য নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলা শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে গেল। বুধবার কলকাতা হাই কোর্টে রাজ্যের তরফে রিপোর্ট পেশ করে জানানো হয়, ওই মন্তব্যের জেরে কোনও আদালতগ্রাহ্য অপরাধ সংঘটিত হয়নি। রাজ্যের রিপোর্টের ভিত্তিতেই প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের (R.V. Ghuge) ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি খারিজ করেছে বলে জানা গিয়েছে।

গত ২ জুন ধর্মতলা এলাকায় একটি কর্মসূচিতে হাদি প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, বিষয়টি নিছক বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।

মামলাকারীর পক্ষ থেকে আদালতে আরও দাবি করা হয়, ওই মন্তব্যের প্রভাব সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে। সেই কারণেই বিষয়টিকে বৃহত্তর জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার আবেদন জানানো হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল হাই কোর্ট।

১ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে কলকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর (Tapabrata Chakraborty) ডিভিশন বেঞ্চ জানতে চেয়েছিল, কেন এই বিষয়টি জনস্বার্থ মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্য নিয়ে আপত্তি থাকলেই সেটিকে জনস্বার্থ মামলার আওতায় আনা যায় কি না।

সেই শুনানিতে আদালত আগের একটি মামলার প্রসঙ্গও টেনে আনে। প্রয়াত তৃণমূল সাংসদ তাপস পালের মন্তব্য ঘিরে দায়ের হওয়া মামলার কথা উল্লেখ করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠার প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছিল। ওই মামলার রায় তপোব্রত চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ দিয়েছিল।

মামলাকারীর আইনজীবী অভ্রতনু সরকার আদালতে দাবি করেছিলেন, মমতার বক্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্যের পর্যায়ে পড়ে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্তব্যের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ এবং দেশের নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। সেই যুক্তিতেই মামলাটি জনস্বার্থ মামলা হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে সওয়াল করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, রাজ্যের তরফে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার জানিয়েছিলেন, পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে জায়গায় মমতা মন্তব্যটি করেছিলেন, মামলাকারী নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এবং ঘটনাস্থলে কোনও অপরাধমূলক কার্যকলাপও পাওয়া যায়নি।

তৃণমূলের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও মামলার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের কোনও ঘটনা কীভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তা স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি Official Secrets Act লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ভিত্তি দেখানো হয়নি বলে আদালতে সওয়াল করা হয়েছিল।

এরপর মামলার পরবর্তী শুনানিতে রাজ্যের রিপোর্ট আদালতে জমা পড়ে। সেই রিপোর্টে মমতার মন্তব্যের মধ্যে কোনও আদালতগ্রাহ্য অপরাধ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। রিপোর্টের বক্তব্য বিবেচনা করে বুধবার মামলাটি খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের ডিভিশন বেঞ্চ।

অর্থাৎ, এই মামলায় আদালত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কোনও অপরাধের বিচার বা দোষ নির্ধারণ করেনি। বরং রাজ্যের রিপোর্টে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ না থাকার বিষয়টি বিবেচনা করেই জনস্বার্থ মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর আগে মামলাটি PIL হিসেবে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়েই আদালত প্রশ্ন তুলেছিল।

ফলে হাদি প্রসঙ্গে মমতার মন্তব্য ঘিরে দায়ের হওয়া আইনি বিতর্ক আপাতত কলকাতা হাই কোর্টেই শেষ হল। মামলাটি খারিজ হলেও রাজনৈতিক বক্তব্যের আইনি সীমা, জনস্বার্থ মামলার গ্রহণযোগ্যতা এবং কোনও বক্তব্য জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে কতটা যুক্ত হতে পারে—এই বৃহত্তর বিতর্ক অবশ্য ভবিষ্যতেও আলোচনায় থাকতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন