১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ লাইনের মাধ্যমে ভারত ভাগের ইতিহাসের পর ব্রিটেনের মানচিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এখন নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের পক্ষে একসঙ্গে সরব। ১৪ সেপ্টেম্বর কার্ডিফে তিন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈঠকে সাংবিধানিক পরিবর্তন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে অবিলম্বে যুক্তরাজ্য ভেঙে যাচ্ছে; বরং বিষয়টি এখন রাজনৈতিক চাপ ও সাংবিধানিক বিতর্কের নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড—এই চার দেশ নিয়ে গঠিত ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব পার্লামেন্ট ও সরকার রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এখনও ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। জাতীয়তাবাদী দলগুলির দীর্ঘদিনের দাবি, স্থানীয় মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকারগুলির হাতে আরও বেশি ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
এই বিতর্কেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে কার্ডিফের বৈঠক। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, ওয়েলসের নেতা রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল নিজেদের রাজনৈতিক দলগুলির নেতা হিসেবে বৈঠকে অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন Sinn Féin-এর প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড। পরে একটি Memorandum of Understanding বা সমঝোতা স্মারক প্রকাশ করা হয়।
সেই সমঝোতায় স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডের মানুষের নিজেদের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্ধারণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। দলগুলির বক্তব্য, ভবিষ্যতের সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট দেশের মানুষের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনটি রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয়েছিল। সেই ভোটে ৫৫.৩ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ৪৪.৭ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রেক্সিট এবং লন্ডনের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে স্বাধীনতার প্রশ্নটি ফের রাজনীতির কেন্দ্রে আসে।
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। গোটা যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিলেও স্কটল্যান্ডে ৬২ শতাংশ ভোটার ইইউ-তে থাকার পক্ষে ছিলেন। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেও ৫৫.৮ শতাংশ ভোটার ইইউ-তে থাকার পক্ষে ভোট দেন। ফলে ব্রেক্সিটের পর এই অঞ্চলগুলির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
স্কটল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পক্ষে থাকা নেতাদের একটি অংশের যুক্তি, যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হলে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে স্বাধীন স্কটল্যান্ডের সম্ভাব্য EU সদস্যপদ কোনও স্বয়ংক্রিয় বিষয় নয়; সেটি নির্ভর করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার উপর।
ওয়েলসের পরিস্থিতি আবার কিছুটা আলাদা। সেখানে Plaid Cymru স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হলেও স্বাধীনতার সমর্থন স্কটল্যান্ডের তুলনায় কম। ফলে ওয়েলসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে পূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি আরও বেশি ক্ষমতা হস্তান্তর বা devolution-এর দাবিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনার দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ওয়েলসে স্বাধীনতার পক্ষে ৩২ শতাংশ সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের প্রশ্নটি আরও আলাদা। সেখানে বিতর্কটি মূলত যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকা বনাম আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনরায় একীভূত হওয়ার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। ১৯৯৮ সালের Good Friday Agreement অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রশ্নে গণভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের তুলনায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক পরিবর্তনের আইনি কাঠামো ভিন্ন।
তিন অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী দলগুলির যুক্তির একটি সাধারণ জায়গা হল ‘গণতান্ত্রিক ঘাটতি’। তাঁদের বক্তব্য, করনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়েস্টমিনস্টারের সিদ্ধান্তের প্রভাব স্থানীয় সরকারের উপর পড়ে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের তুলনায় জনসংখ্যা কম হওয়ায় তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দ অনেক সময় যুক্তরাজ্যব্যাপী সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে চাপা পড়ে যায়—এমন অভিযোগ স্বাধীনতাপন্থীদের।
তবে তিন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও ২০১৪ সালের গণভোট রয়েছে। ওয়েলসে স্বাধীনতার পাশাপাশি আরও ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি গুরুত্বপূর্ণ। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে আবার মূল প্রশ্নটি আইরিশ ঐক্যকে ঘিরে। ফলে তিন পক্ষ একসঙ্গে সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি তুললেও তাঁদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আইনি পথ এক নয়। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও এই পার্থক্যগুলির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১৪ সেপ্টেম্বরের কার্ডিফ সমঝোতা যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করেছে। কিন্তু এই চুক্তি নিজে কোনও অঞ্চলকে যুক্তরাজ্য থেকে বের করে দিচ্ছে না। স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের জন্য পৃথক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে আপাতত ব্রিটেন ভেঙে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে তিন অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমন্বিত চাপই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।



