মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুর মামলা ঘিরে কলকাতা হাই কোর্টে মঙ্গলবার এক ব্যতিক্রমী মুহূর্তের সাক্ষী থাকল আদালত। শুনানি শুরুর আগেই বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত জানিয়ে দিলেন, তাঁর দাদা বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র। এরপর তিনি জানতে চান, এই পরিস্থিতিতে তাঁর এজলাসে মামলার শুনানি নিয়ে কোনও আপত্তি রয়েছে কি না। মমতার আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের কোনও আপত্তি নেই।
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করেছেন তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানির শুরুতেই বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরেন।
বিচারপতি বলেন, মামলার গুণগত দিক নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা তাঁর কর্তব্য। তিনি জানান, তাঁর দাদা বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র এবং ভবিষ্যতে কোনও প্রশ্ন যাতে না ওঠে, সেই কারণেই তিনি বিষয়টি আদালতকে জানাচ্ছেন।
বিচারপতির বক্তব্যের পর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জানান, বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের এজলাসে আগেও তাঁরা মামলা লড়েছেন, কখনও জিতেছেন, কখনও হেরেছেন। তাই বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে তাঁদের কোনও সংশয় নেই।
মামলার মূল শুনানিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ভবানীপুর বিধানসভা নির্বাচনে অনিয়মের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে ভোটগণনার দিনে। তাঁর দাবি, গণনাকেন্দ্র থেকে কাউন্টিং এজেন্টকে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেননি।
শুনানির সময় ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গও তোলেন কল্যাণ। তাঁর অভিযোগ, ওই নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং অফিসারকেই এবার ভবানীপুরে একই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নন্দীগ্রামের ভোট নিয়েও অতীতে আদালতে নির্বাচনী পিটিশন দাখিল হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা বর্তমান মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবালের ভূমিকাও তুলে ধরেন তৃণমূলের আইনজীবী। তাঁর দাবি, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই তাঁকে মুখ্যসচিব করা হয় এবং একসময় তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একসঙ্গে সামলেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তের প্রসঙ্গও আদালতে উত্থাপন করা হয়। কল্যাণের বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী এসআইআর প্রক্রিয়ায় তিনি পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণেই ভবানীপুর বিধানসভা এলাকায় ৪৪ হাজারেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। উল্লেখ্য, ওই কেন্দ্রে তাঁর মক্কেল ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন।
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন জানিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের কাছে অনুরোধ করেন, নির্বাচনী পিটিশন দীর্ঘদিন ঝুলে না রেখে দ্রুত শুনানি শেষ করে রায় দেওয়া হোক।
শুনানি শেষে বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন। তিনি জানান, গণনাকেন্দ্রের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যালট ইউনিট, কন্ট্রোল ইউনিট, ভিভিপ্যাট মেশিন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় নথি ও সামগ্রী সংরক্ষণ করতে হবে। কোনও কিছু নষ্ট করা যাবে না। আদালত জানিয়েছে, তিন সপ্তাহ পরে মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।



