তারাতলার নির্মীয়মাণ গোডাউন ধসের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল তিন। এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে একাধিক শ্রমিক আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাথমিক রিপোর্টে ‘ত্রুটিযুক্ত প্ল্যান’-এর ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কড়া পদক্ষেপেরও ঘোষণা করেছেন তিনি।
বুধবার দুপুরে তারাতলার ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নির্মীয়মাণ একটি গোডাউন আচমকাই ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে লোহার কাঠামো ও কংক্রিটের নীচে চাপা পড়েন বহু শ্রমিক। দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, এনডিআরএফ এবং সেনাবাহিনী যৌথভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, এখনও পর্যন্ত ২১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন জীবিত এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও ১২ থেকে ১৮ জন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকতে পারেন বলে প্রশাসনের অনুমান।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তাতে নির্মাণ পরিকল্পনায় ত্রুটির ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন এবং বিস্তারিত রিপোর্ট রাতের মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে।
উদ্ধারকাজের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারত। তিনি সিভিল ডিফেন্স, কলকাতা পুলিশ, দমকল এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপের জন্যও ধন্যবাদ জানান।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, দুপুর আড়াইটে নাগাদ মুখ্যসচিবের সঙ্গে আলোচনা করে সেনাবাহিনীর সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর বিকেল সাড়ে তিনটার পর থেকে সেনার বিশেষ দল উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়।
আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিতে বিশেষ গ্রিন করিডর তৈরি করা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের নেতৃত্বে একাধিক মেডিক্যাল টিম এবং প্রায় ২০টি অ্যাম্বুল্যান্স উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। গুরুতর আহতদের এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, কলকাতা পুরসভার নথি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। নির্মাণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শম্ভুনাথ বেহেরা নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন সংস্থার নামও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর রাজ্য সরকার বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা বা জরুরি পরিষেবা সংক্রান্ত প্রকল্প ছাড়া রাজ্যের সমস্ত নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক নির্মাণকাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি প্রকল্পের নিরাপত্তা ও নথিপত্রের অডিট করা হবে।
সরকারের নির্দেশ, যেসব প্রকল্প নিরাপত্তা ও অনুমোদনের সমস্ত শর্ত পূরণ করবে, কেবল তারাই আগামী ১ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করার অনুমতি পাবে।
তারাতলা বিপর্যয়ের পর নির্মাণ নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট সামনে এলে এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণ হবে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।



