তারাতলা বিপর্যয়ে উঠছে নির্মাণে গাফিলতির অভিযোগ, লিজ নেওয়া সংস্থা ও ফিরহাদ ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

তারাতলায় নির্মীয়মাণ ইমারত ধসের ঘটনায় নির্মাণ সংস্থা, কাঠামোগত ত্রুটি ও নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুরু হতে চলেছে বিস্তারিত তদন্ত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

তারাতলার নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চলার পাশাপাশি সামনে আসতে শুরু করেছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, দুর্বল কাঠামো এবং তাড়াহুড়ো করে ঢালাইয়ের কাজ— এই সব কারণেই বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন স্থানীয়দের একাংশ। একই সঙ্গে লিজ নেওয়া সংস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বুধবার ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নির্মীয়মাণ একটি ইমারত আচমকাই ভেঙে পড়ে। ঘটনায় একাধিক শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েন। উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে রয়েছে পুলিশ, দমকল, সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, যে জমিতে নির্মাণকাজ চলছিল সেটি কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীন। প্রায় ৬,৬৮৯ বর্গমিটার জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজে নিয়ে সেখানে গুদাম এবং হিমঘর নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, দুর্বল ভিতের উপর লোহার বিম বসিয়ে দ্রুতগতিতে বহুতল নির্মাণের কাজ চলছিল। বুধবার সকাল থেকেই কিছু বিমে অস্বাভাবিক বেঁকে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে সেই অবস্থায় কোনও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা বা নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ঘটনার সময় ভবনের উপরের অংশে ঢালাইয়ের কাজ চলছিল বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উদ্ধারকারী দলের একাংশের অনুমান, ইস্পাত কাঠামোর উপর অতিরিক্ত ওজনের কংক্রিট ঢালাইয়ের ফলে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

এই ঘটনার জেরে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। শোনা যাচ্ছে স্থানীয় কাউন্সিলর আনোয়ার খানের নাম। তিনি কলকাতা বন্দরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম ঘনিষ্ঠ। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলির সত্যতা বিচারাধীন।

এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর জানান, ভেঙে পড়া ইমারতটি কলকাতা পুরসভার অনুমোদিত প্রকল্প ছিল। তাঁর দাবি, ভবনের নকশা এবং নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে। প্রাথমিকভাবে নকশাগত ত্রুটির সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হবে। নির্মাণ সংস্থা, ঠিকাদার, প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ— সকলের ভূমিকাই খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের সমস্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তারাতলা বিপর্যয় শুধু একটি নির্মাণ দুর্ঘটনা নয়, বরং নির্মাণ নিরাপত্তা এবং তদারকির প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য প্রকৃতপক্ষে কারা দায়ী এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রুখতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন