নিজের লোকসভা কেন্দ্র কৃষ্ণনগরে ফের বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra)। বুধবার নদিয়ার তেহট্টে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে। চলন্ত গাড়ি থেকে ফেসবুক লাইভ করছিলেন সাংসদ; সেই সময়ই বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থেকে ডিম ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। পরে ক্যামেরা ঘুরিয়ে জামাকাপড়ে ডিমের দাগও দেখান মহুয়া।
ঘটনার পর ফের প্রশ্ন উঠেছে মহুয়ার নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ, চলতি মাসের শুরুতেই তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court) নির্দেশ দিয়েছিল, কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রে সফরের সময় তাঁর সঙ্গে অতিরিক্ত দু’জন পুলিশকর্মী মোতায়েন করতে হবে। এই ব্যবস্থা ৩০ দিনের জন্য কার্যকর রাখার কথা জানিয়েছিল আদালত।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নিজের লোকসভা কেন্দ্রে যাওয়ার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে মহুয়া মৈত্রকে কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারকে সফরের বিষয়ে জানাতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল।
তবে বুধবারের ঘটনায় পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই কীভাবে তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংসদ। ফেসবুক লাইভে মহুয়ার অভিযোগ, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং হেনস্থা করা হয়েছে। ঘটনাটিকে তিনি আদালতের নির্দেশ অমান্যের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।
অন্যদিকে, কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি কে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ মেনেই মহুয়ার সঙ্গে একজন অফিসার-সহ মোট দু’জন পুলিশকর্মী পাঠানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর সাংসদ নিজের সংসদীয় এলাকায় থাকবেন বলে ইমেলে জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোথায় থাকবেন বা বুধবার তেহট্টে কর্মসূচি রয়েছে—সে বিষয়ে পুলিশকে আলাদা করে জানানো হয়নি।
পুলিশ সুপারের দাবি, পরে জানা যায় তেহট্টে মহুয়ার কর্মীদের নিয়ে একটি বৈঠক রয়েছে। সেখানে কিছু মানুষ স্লোগান দেন এবং সাংসদকে লক্ষ্য করে কেউ ডিম ছোড়ে। অর্থাৎ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হলেও কর্মসূচির নির্দিষ্ট তথ্য আগে থেকে পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নটিও এখন সামনে এসেছে।
বুধবার তেহট্টের হাউলিয়া মোড়ে তৃণমূলের কর্মিসভা ছিল। সেই কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময়ই মহুয়াকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয় বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীদের একাংশ কালো পতাকা দেখান এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
কর্মিসভা শেষ করে বেরনোর সময়ও বিক্ষোভের মুখে পড়েন সাংসদ। সেই সময় গাড়িতে বসেই ফেসবুক লাইভ করেন মহুয়া। লাইভে তিনি ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং তাঁর দিকে ডিম ছোড়ার অভিযোগ করেন। পরে ক্যামেরা ঘুরিয়ে পোশাকে ডিমের দাগ দেখান বলেও তাঁর বক্তব্য সামনে এসেছে।
এর আগে কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় মহুয়ার সফর ঘিরে বিক্ষোভ এবং তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম-সহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনাগুলির পরই তিনি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চ তাঁর নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেয়।
আদালতের সেই নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে মহুয়া যাতে নিজের সংসদীয় এলাকায় রাজনৈতিক ও সাংসদীয় দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং তাঁকে হয়রানি বা বাধার মুখে পড়তে না হয়। ৩০ দিনের এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার পর রাজ্যকে আদালতে রিপোর্টও জমা দিতে বলা হয়েছে; মামলার পরবর্তী শুনানি ১ অক্টোবর।
তেহট্টের নতুন ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাই ফের রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মহুয়ার অভিযোগ একদিকে, অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্যে সফরের আগাম তথ্য দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ডিম ছোড়ার ঘটনার পিছনে কারা ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। একইসঙ্গে হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সাংসদের নিরাপত্তা বাস্তবে কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।



