‘মহালয়া’ শব্দটি শুনলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীর আবৃত্তি আর পুজোর গন্ধ। তবে এর বাইরেও রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। মহালয়া মানে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনা। হিন্দু মতে, এই দিন পিতৃপুরুষেরা মর্ত্যে আগমন করেন, আর তাই এদিন তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা ও তর্পণ নিবেদন করা হয়। ২০২৬ সালে মহালয়া পড়ছে ১০ অক্টোবর, শনিবার। তর্পণের সঠিক পদ্ধতি জানতে এখানে পড়ুন।
‘মহালয়া’ শব্দের মানে কী?
‘মহালয়া’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘মহা’ ও ‘আলয়’ এই দুই শব্দ থেকে। এর অর্থ হতে পারে ‘মহৎ আশ্রয়স্থল’। আবার, কিছু মত অনুসারে, এটি ‘প্রেতদের আলয়’ বা আত্মার আশ্রয়স্থল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। আসলে, ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দটি হওয়া উচিত ছিল ‘মহালয়’, কিন্তু সংস্কার, রীতি এবং অনুভূতির কারণে শব্দটি হয়ে উঠেছে ‘মহালয়া’, যা আজকের দিনে স্ত্রীলিঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত।
মহালয়া ও তর্পণের মাহাত্ম্য
হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, পূর্বপুরুষদের তিন পুরুষ পর্যন্ত আত্মা পিতৃলোকে অবস্থান করে। মহালয়ার দিন তাঁরা মর্ত্যে আসেন, এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান ও তর্পণ করলে আত্মা শান্তি পায়। এই তর্পণের মাধ্যমে আমরা শুধু আত্মার শান্তি কামনা করি না, পরিবারের উপর তাঁদের আশীর্বাদ চাওয়াও হয়। দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সম্পূর্ণ সূচি ও দেবীর আগমন-গমন জানতে এখানে পড়ুন।
মহাভারতের কর্ণ কীভাবে মহালয়ার সঙ্গে যুক্ত?
মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাভারতের এক চমকপ্রদ কাহিনি। কর্ণ যখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করে। সেখানে তাঁকে খাদ্যের পরিবর্তে স্বর্ণ ও রত্ন দেওয়া হয়। কর্ণ অবাক হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেন— খাদ্যের বদলে ধনরত্ন কেন? ইন্দ্র উত্তরে জানান, “তুমি জীবদ্দশায় সোনা-রূপো অনেক দান করেছো, কিন্তু পূর্বপুরুষদের জন্য কোনোদিন জল বা অন্ন উৎসর্গ করোনি। তাই এই প্রতিদান।”
কর্ণ জানান, তিনি নিজের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তখন ইন্দ্র তাঁকে ১৫ দিনের জন্য মর্ত্যে পাঠান, যাতে তিনি তর্পণ করতে পারেন। সেই ১৫ দিনই পরিণত হয় পিতৃপক্ষে, আর শেষ দিনটি মহালয়া।
তর্পণের রীতি কীভাবে শুরু হলো?
এই কর্ণের কাহিনিকেই অনুপ্রেরণা বলে ধরা হয় তর্পণের রীতির সূচনা হিসেবে। সেই দিন থেকে মহালয়া শুধুই পুজোর আগমনী সংকেত নয়, বরং এক পবিত্র আত্মিক কর্তব্য। এই দিনে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হলে, পরিবারে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ আসে বলে বিশ্বাস। পুজোর প্রস্তুতির ১০টি জরুরি কাজ নিয়ে বিস্তারিত জানতে এখানে পড়ুন।
মহালয়া মানেই পুজোর সূচনা
মহালয়ার আরেকটি দিক হল— এই দিন থেকেই শুরু হয় দেবীপক্ষ। এই দিনে প্রতিমাশিল্পীরা দেবী দুর্গার চোখ আঁকা বা চক্ষুদান করেন, যা দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার সূচনা। তাই মহালয়া হল আত্মিক দায়িত্ব ও উৎসবের আনন্দের সংমিশ্রণ। দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট ও শুভক্ষণ জানতে এখানে পড়ুন।
FAQ (প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন):
প্রশ্ন ১: মহালয়া কী?
উত্তর: মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনা। এই দিনে তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
প্রশ্ন ২: মহাভারতের কর্ণ কীভাবে মহালয়ার সঙ্গে যুক্ত?
উত্তর: কর্ণ মৃত্যুর পর স্বর্গে খাদ্যের বদলে ধনরত্ন পেয়ে ইন্দ্রের কাছে জানতে চান কারণ। জানা যায়, তিনি তর্পণ না করায় তাঁকে ফের মর্ত্যে পাঠানো হয় ১৫ দিনের জন্য। এই কাহিনি থেকেই তর্পণের রীতি শুরু।
প্রশ্ন ৩: মহালয়া কেন স্ত্রীলিঙ্গ?
উত্তর: ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি পুরুষলিঙ্গ হওয়ার কথা, কিন্তু দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হিসেবে মনে করা হয় বলে শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: মহালয়া ও তর্পণের মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর: মহালয়ার দিনে আত্মীয়স্বজনের আত্মা মর্ত্যে আসেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়।



